সন্তানকে শুধু স্কুলে পাঠালেই দায়িত্ব শেষ হয় না

mufti abdullah al hadi
Mufti Abdullah Al Hadi

বর্তমান যুগে একজন বাবা–মায়ের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন কী?

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তর হবে—“আমার সন্তান মানুষ হোক, প্রতিষ্ঠিত হোক, বড় কিছু করুক।”

এই স্বপ্ন পূরণের জন্য বাবা–মা কত ত্যাগই না করেন! কেউ নিজের সুখ–স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দেন, কেউ রাতদিন পরিশ্রম করেন, কেউ বিদেশে গিয়ে বছরের পর বছর পরিবার থেকে দূরে থাকেন। সব কষ্টের পেছনে একটি উদ্দেশ্য—সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ।

আজকের সমাজে সন্তানের ভবিষ্যৎ বলতে আমরা সাধারণত বুঝি—

  • ভালো স্কুলে ভর্তি হওয়া
  • GPA-5
    পাওয়া
  • মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চান্স পাওয়া
  • বড় চাকরি করা
  • বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়া
  • অর্থ ও সামাজিক মর্যাদা অর্জন করা

এসব বিষয় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম কখনো দুনিয়াবি উন্নতির বিরুদ্ধে নয়। বরং ইসলাম চায় একজন মুসলিম দুনিয়া ও আখিরাত—দুই জায়গাতেই সফল হোক। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন আমরা দুনিয়াবি সফলতাকেই সবকিছু মনে করি এবং সন্তানের চরিত্র, ঈমান, আখলাক ও দ্বীনি শিক্ষাকে গৌণ করে ফেলি।

আজ অনেক বাবা–মা মনে করেন সন্তানের দায়িত্ব শুধু তাকে ভালো স্কুলে ভর্তি করানো, কোচিং করানো এবং পরীক্ষায় ভালো ফলাফল নিশ্চিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ বাস্তবতা হলো—এটি দায়িত্বের একটি ছোট অংশ মাত্র। প্রকৃত দায়িত্ব আরও অনেক বড়, আরও গভীর এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ একটি সন্তান শুধু বই পড়ে মানুষ হয় না। একটি সন্তান মানুষ হয় পরিবার, পরিবেশ, আদর্শ, চরিত্র, শিক্ষা, আখলাক, ঈমান এবং দ্বীনি মূল্যবোধের মাধ্যমে। স্কুল তাকে গণিত, বিজ্ঞান, ইংরেজি বা প্রযুক্তি শেখাতে পারে; কিন্তু সত্যবাদিতা, তাকওয়া, লজ্জাশীলতা, আল্লাহভীতি, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং নৈতিকতা শেখানোর মূল দায়িত্ব বাবা–মায়ের উপরই বর্তায়।

mufti abdullah al hadi


আজকের শিক্ষাব্যবস্থার বড় সংকট

বর্তমান যুগে শিক্ষাব্যবস্থা যত আধুনিক হচ্ছে, ততই নৈতিক সংকট বাড়ছে। শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু আদর্শ মানুষের সংখ্যা কমছে। বড় বড় ডিগ্রি আছে, কিন্তু চরিত্র নেই। প্রযুক্তিগত জ্ঞান আছে, কিন্তু আল্লাহভীতি নেই। সামাজিক অবস্থান আছে, কিন্তু বাবা–মায়ের প্রতি সম্মান নেই।

আজ আমরা এমন অনেক তরুণ দেখি—

  • যারা ইংরেজিতে সাবলীল,
    কিন্তু কুরআন পড়তে পারে না
  • যারা প্রযুক্তিতে দক্ষ,
    কিন্তু নামাজের গুরুত্ব বোঝে না
  • যারা ক্যারিয়ার নিয়ে সচেতন,
    কিন্তু হালাল–হারামের ব্যাপারে উদাসীন
  • যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়,
    কিন্তু পারিবারিক দায়িত্ববোধহীন

এটি শুধু সমাজের ব্যর্থতা নয়; এটি পরিবার ব্যবস্থারও ব্যর্থতা। কারণ আমরা সন্তানকে “সফল” বানানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু “সৎ ও দ্বীনদার” বানানোর চেষ্টা যথেষ্ট করিনি।

সন্তান আল্লাহর দেওয়া একটি আমানত

ইসলামে সন্তানকে শুধু পারিবারিক সদস্য হিসেবে দেখা হয়নি। বরং সন্তানকে আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি আমানত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই আমানতের হক আদায় করা প্রত্যেক বাবা–মায়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার–পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো,
যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।”
— সূরা তাহরীম: ৬

এই আয়াতের মধ্যে বাবা–মায়ের দায়িত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সন্তানকে শুধু দুনিয়াবি সফলতার দিকে ঠেলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হবে না; বরং তাকে আখিরাতের সফলতার পথেও পরিচালিত করতে হবে।

আজ অনেক বাবা–মা সন্তানের স্কুল ফি দিতে কখনো দেরি করেন না, কিন্তু তাকে কুরআন শেখানোর সময় পান না। সন্তানের পরীক্ষার রেজাল্ট খোঁজ নেন, কিন্তু নামাজ পড়ে কিনা খোঁজ নেন না। কোচিংয়ের সময়সূচি জানেন, কিন্তু সে কোন বন্ধুদের সাথে মিশছে তা জানেন না। সন্তান মোবাইলে কী দেখছে, কী শিখছে, কী ধরনের চিন্তাভাবনা গড়ে উঠছে—এসব নিয়ে তাদের অনেকেরই কোনো মাথাব্যথা নেই।


ফলাফল কী হচ্ছে?

সন্তান বড় হচ্ছে, কিন্তু দ্বীন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

সে শিক্ষিত হচ্ছে,
কিন্তু মানবিক হচ্ছে না।

সে আধুনিক হচ্ছে,
কিন্তু চরিত্র হারাচ্ছে।

সে স্মার্ট হচ্ছে,
কিন্তু আল্লাহভীতি হারিয়ে ফেলছে।

সে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে,
কিন্তু পারিবারিকভাবে ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে।

পরিবারই সন্তানের প্রথম বিদ্যালয়

একটি শিশু পৃথিবীতে আসার পর তার প্রথম শিক্ষালয় হলো পরিবার। মা–বাবাই তার প্রথম শিক্ষক। সন্তান সবচেয়ে বেশি শেখে তার পরিবারের মানুষদের কাছ থেকে। বাবা–মায়ের আচরণ, কথাবার্তা, রাগ, ভালোবাসা, সততা, ইবাদত—সবকিছু সন্তানের উপর গভীর প্রভাব ফেলে।

আপনি যদি সন্তানকে সত্যবাদী বানাতে চান, আগে নিজেকে সত্যবাদী হতে হবে।

আপনি যদি সন্তানকে নামাজি বানাতে চান,
আগে নিজে নামাজের গুরুত্ব দিতে হবে।

আপনি যদি সন্তানকে ভদ্র আচরণ শেখাতে চান,
তাহলে আপনাকেও ভদ্র আচরণ করতে হবে।

আপনি যদি সন্তানকে কুরআনের প্রতি ভালোবাসা শেখাতে চান,
তাহলে ঘরেও কুরআনের পরিবেশ থাকতে হবে।

আজ অনেক বাবা–মা সন্তানকে বলেন—
“মোবাইল কম ব্যবহার করো।”

কিন্তু নিজেরাই সারাদিন ফোনে ব্যস্ত থাকেন।

সন্তানকে বলেন—
“মিথ্যা বলবে না।”

কিন্তু ফোনে কারো সাথে কথা বলার সময় সন্তানের সামনেই মিথ্যা বলেন।

সন্তানকে বলেন—
“নামাজ পড়ো।”

কিন্তু নিজেরাই নামাজে অলসতা করেন।

মনে রাখতে হবে, সন্তান উপদেশের চেয়ে উদাহরণ বেশি অনুসরণ করে। আপনি যা করবেন, সন্তান সেটাই শিখবে।

বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় ফিতনা: মোবাইল ও ইন্টারনেট

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো মোবাইল আসক্তি। আগে সন্তানদের নষ্ট হওয়ার ভয় ছিল খারাপ বন্ধুর কারণে; এখন সেই ভয় আরও ভয়ংকর আকারে এসেছে ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে।

আজ ছোট ছোট শিশুরাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল স্ক্রিনে ডুবে থাকে। অনেক বাবা–মা নিজের কাজের সুবিধার জন্য সন্তানকে ছোট বয়সেই ফোন হাতে তুলে দেন। প্রথমে কার্টুন, তারপর গেম, এরপর ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক—একসময় সন্তান এমন এক জগতে প্রবেশ করে যেখানে অশ্লীলতা, সহিংসতা, নাস্তিকতা ও বিভ্রান্তিকর চিন্তাধারা খুব সহজেই পৌঁছে যায়।

অনেক বাবা–মা বুঝতেই পারেন না—

  • সন্তান কী দেখছে
  • কার সাথে কথা বলছে
  • কী ধরনের কনটেন্ট অনুসরণ করছে
  • কী ধরনের চিন্তাভাবনা গড়ে উঠছে
  • কোন মানুষকে আইডল হিসেবে নিচ্ছে

ফলাফল হিসেবে দেখা যায়—

  • পড়াশোনায় অমনোযোগ
  • মানসিক অস্থিরতা
  • রাগী স্বভাব
  • পরিবার থেকে দূরত্ব
  • নামাজ ও দ্বীন থেকে বিমুখতা
  • অশ্লীলতায় আসক্তি
  • একাকীত্ব ও হতাশা
  • আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা

শুধু ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলে এসব সমস্যা সমাধান হবে না। সন্তানকে সময় দিতে হবে, তার সাথে কথা বলতে হবে এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে।


শুধু ক্যারিয়ার নয়, চরিত্রও গুরুত্বপূর্ণ

আজকের সমাজে ক্যারিয়ারকে এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে যে, চরিত্রের গুরুত্ব অনেকটাই কমে গেছে। কেউ যদি বড় চাকরি পায়, আমরা তাকে সফল বলি—যদিও তার আখলাক খারাপ হয়। কেউ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হলে আমরা গর্ব করি—যদিও সে দ্বীন থেকে দূরে থাকে।

ইসলাম শুধু সফল পেশাজীবী তৈরি করতে চায় না; ইসলাম চায় আদর্শ মানুষ তৈরি করতে।

একজন ডাক্তার যদি আল্লাহভীরু না হন, তাহলে তিনি রোগীর সাথে অন্যায় করতে পারেন।

একজন ব্যবসায়ী যদি সৎ না হন,
তাহলে মানুষের অধিকার নষ্ট করবেন।

একজন শিক্ষক যদি চরিত্রবান না হন,
তাহলে তিনি পুরো প্রজন্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেন।

একজন সাংবাদিক যদি সত্যবাদী না হন,
তাহলে সমাজে মিথ্যা ছড়িয়ে পড়বে।

একজন নেতা যদি আল্লাহকে ভয় না করেন,
তাহলে পুরো জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তাই সন্তানকে শুধু “কি হবে” তা শেখানো যথেষ্ট নয়; বরং “কেমন মানুষ হবে” সেটিও শেখাতে হবে।

দ্বীনি শিক্ষা ছাড়া সন্তান অপূর্ণ থেকে যায়

অনেক বাবা–মা মনে করেন, দ্বীনের শিক্ষা বড় হয়ে নিলেও চলবে। কিন্তু বাস্তবে শিশুকালই চরিত্র গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। ছোটবেলায় যে শিক্ষা হৃদয়ে প্রবেশ করে, সেটি সারাজীবন প্রভাব ফেলে।

সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে—

  • নামাজের গুরুত্ব
  • কুরআনের সাথে সম্পর্ক
  • সত্যবাদিতা
  • হালাল–হারামের পার্থক্য
  • বাবা–মায়ের সম্মান
  • শালীনতা ও পর্দা
  • মানুষের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি
  • গীবত,
    মিথ্যা ও অহংকারের ক্ষতি
  • সময়ের মূল্য
  • আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা

শুধু মুখে শেখালে হবে না; ঘরের পরিবেশেও তা থাকতে হবে। যদি ঘরে সারাদিন গান–বাজনা, সিনেমা, অশ্লীলতা ও অশান্তি চলে, তাহলে সন্তানকে দ্বীনমুখী করা কঠিন হয়ে যাবে।

বাবা–মায়ের সময় না দেওয়া বড় সমস্যা

বর্তমান যুগে অনেক বাবা–মা সন্তানের জন্য অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে সন্তানের কাছ থেকেই দূরে সরে যাচ্ছেন। কেউ ব্যবসায় ব্যস্ত, কেউ চাকরিতে ব্যস্ত, কেউ আবার নিজের মোবাইল নিয়েই ব্যস্ত। ফলে সন্তান মানসিকভাবে একাকী হয়ে পড়ে।

একটি সন্তান সবচেয়ে বেশি চায়—

  • বাবা–মায়ের ভালোবাসা
  • সময়
  • মনোযোগ
  • প্রশংসা
  • নিরাপদ পরিবেশ
  • নিজের কথা বলার সুযোগ

আজ অনেক সন্তান আছে, যারা বাবা–মায়ের সাথে বসে মন খুলে কথা বলতে পারে না। ফলে তারা বাইরের মানুষের কাছে মানসিক আশ্রয় খোঁজে। বর্তমান যুগে সেই “বাইরের মানুষ” অনেক সময় হয় ইউটিউবার,
টিকটকার বা সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সার।


ইসলামি পরিবেশ ছাড়া সন্তান নিরাপদ নয়

একটি গাছ যেমন ভালো মাটিতে সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠে, তেমনি সন্তানও ভালো পরিবেশে আদর্শভাবে গড়ে ওঠে। যদি ঘরে ইসলামি পরিবেশ না থাকে, তাহলে সন্তানকে দ্বীনের পথে রাখা কঠিন হয়ে যায়।

ইসলামি পরিবেশ মানে শুধু ওয়াজ শোনা নয়; বরং এমন একটি পরিবার—

  • যেখানে নামাজের গুরুত্ব আছে
  • যেখানে কুরআন তিলাওয়াত হয়
  • যেখানে হারাম বিনোদনের আধিক্য নেই
  • যেখানে শালীনতা বজায় থাকে
  • যেখানে মিথ্যা ও গীবত কম
  • যেখানে আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা শেখানো হয়
  • যেখানে বাবা–মা সন্তানকে সময় দেন
  • যেখানে দ্বীনি আলোচনা হয়

বন্ধু নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

অনেক বাবা–মা সন্তানের বন্ধুদের ব্যাপারে কোনো খোঁজ রাখেন না। অথচ একজন শিশুর চরিত্র গঠনে বন্ধুর ভূমিকা অনেক বড়। খারাপ বন্ধু ধীরে ধীরে একজন ভালো সন্তানকেও ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে।

রাসূল ﷺ বলেছেনঃ
“মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর থাকে।”

তাই বাবা–মায়ের উচিত—

  • সন্তানের বন্ধুদের সম্পর্কে জানা
  • কোথায় যায় খোঁজ রাখা
  • কার সাথে সময় কাটায় তা দেখা
  • প্রয়োজনে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দেওয়া
  • ভালো পরিবেশে রাখার চেষ্টা করা

অতিরিক্ত চাপও ক্ষতিকর

অনেক বাবা–মা সন্তানের উপর এত বেশি পড়াশোনার চাপ দেন যে, সন্তান মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। সারাদিন স্কুল, কোচিং, প্রাইভেট—জীবনটাই যেন একটি প্রতিযোগিতা হয়ে যায়।

ফলে দেখা যায়—

  • সন্তান মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে
  • আত্মবিশ্বাস হারায়
  • রাগী হয়ে যায়
  • হতাশায় ভোগে
  • অনেক সময় আত্মহত্যার চিন্তাও করে
  • পরিবার থেকে দূরে সরে যায়

শুধু GPA বা রেজাল্টই জীবনের সবকিছু নয়। একটি সন্তান মানসিকভাবে সুস্থ, চরিত্রবান ও দ্বীনদার হওয়া আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

দুনিয়ার সফলতা সবকিছু নয়

আজ আমরা দুনিয়াবি সফলতাকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানিয়ে ফেলেছি। কিন্তু মৃত্যু আসার পর এসব ডিগ্রি, টাকা বা পদমর্যাদা কোনো কাজে আসবে না, যদি ঈমান ও আমল ঠিক না থাকে।

একজন বাবা–মায়ের প্রকৃত সফলতা তখনই, যখন তার সন্তান দ্বীনদার, চরিত্রবান ও আল্লাহভীরু হয়। কারণ নেক সন্তান বাবা–মায়ের জন্য সদকায়ে জারিয়া।

রাসূল ﷺ বলেছেনঃ
“মানুষ মারা গেলে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়,
তবে তিনটি আমল বন্ধ হয় না— সদকায়ে জারিয়া,
উপকারী জ্ঞান এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।”
— সহিহ মুসলিম

এখন আমাদের কী করা উচিত?

প্রথমত, সন্তানকে সময় দিতে হবে। শুধু টাকা দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়। তার মন বুঝতে হবে, কথা শুনতে হবে এবং তার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ঘরে ইসলামি পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পরিবারের সবাই মিলে নামাজ পড়া, কুরআন তিলাওয়াত করা এবং দ্বীনি আলোচনা করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয়ত, সন্তানকে ভালোবাসা দিয়ে দ্বীনের পথে আনতে হবে। কঠোরতা নয়, সুন্দর আচরণ ও ভালোবাসা বেশি কার্যকর।

চতুর্থত, নিজের চরিত্র ঠিক করতে হবে। কারণ সন্তান সবচেয়ে বেশি শেখে বাবা–মাকে দেখে।

পঞ্চমত, সন্তানকে শুধু দুনিয়ার জন্য নয়, আখিরাতের জন্যও প্রস্তুত করতে হবে।

ষষ্ঠত, সন্তানের মানসিক অবস্থার দিকেও নজর দিতে হবে। সে কষ্টে আছে কিনা, হতাশ কিনা, একাকী হয়ে যাচ্ছে কিনা—এসব বিষয়ও বুঝতে হবে।

উপসংহার

সন্তানকে শুধু স্কুলে পাঠিয়ে দিলে দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং প্রকৃত দায়িত্ব হলো তাকে এমন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, যে দুনিয়াতেও উপকারী হবে এবং আখিরাতেও সফল হবে।

আজ আমরা যদি শুধু ক্যারিয়ারের চিন্তা করি কিন্তু ঈমান ও চরিত্র গঠনের চিন্তা না করি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভয়ংকর সংকটে পড়বে।

তাই আসুন, আমরা সন্তানকে শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, জীবনের জন্য প্রস্তুত করি। শুধু চাকরির জন্য নয়, জান্নাতের জন্যও প্রস্তুত করি।

একটি সন্তান যদি আল্লাহভীরু হয়, চরিত্রবান হয়, সত্যবাদী হয় এবং মানুষের উপকারে আসে—তাহলেই একজন বাবা–মায়ের জীবন সফল। কারণ দুনিয়ার বড় বড় অর্জনের চেয়েও একটি নেক সন্তানের মূল্য অনেক বেশি।

আল্লাহ আমাদের সন্তানদের নেক, দ্বীনদার, চরিত্রবান ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার তাওফিক দান করুন। আমীন।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top