লেখক: শিশুশিক্ষা ও প্যারেন্টিং গবেষক মুফতি আব্দুল্লাহ আল হাদী [এম.এ, ঢাবি] |
পরিচালক: তাকওয়া শিশু একাডেমি ও মাদরাসাতুল ঈমান, ঢাকা।
![]() |
| Mufti Abdullah Al Hadi |
সেরা ফলাফল নিশ্চিত করতে গৃহশিক্ষক বা কোচিংয়ের ব্যবস্থা করি এবং তাদের বিভিন্ন দক্ষতা অর্জনে সর্বাত্মক বিনিয়োগ করি। কিন্তু কখনো কি গভীরভাবে ভেবে দেখেছি—সন্তানের সত্যবাদিতা,
দায়িত্ববোধ, দয়া, ধৈর্য এবং মানুষের সঙ্গে আচরণের ভিত কতটা মজবুত হচ্ছে?
বর্তমান প্রতিযোগিতাপূর্ণ সময়ে অনেক সন্তান প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় দারুণ সফল হলেও আচরণে হয়ে পড়ছে আত্মকেন্দ্রিক বা অস্থির। শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন একটি জীবন্ত আদর্শ। একজন মুসলিম পরিবারের জন্য সেই চিরন্তন ও নিখুঁত আদর্শ হলেন বিশ্বমানবতার শিক্ষক প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ। শিশুর মন যখন নরম মাটির মতো থাকে,
তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর জীবন ও আদর্শ তার হৃদয়ে গেঁথে দিলে সে একজন মানবিক, আল্লাহভীরু ও চরিত্রবান মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে।
“সীরাত” বলতে কী বোঝায়?
আরবি ‘সীরাত’ (سيرة) শব্দের আভিধানিক অর্থ পথ, চলন, চরিত্র বা জীবনধারা। ইসলামিক পরিভাষায় সীরাত বলতে বোঝায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ–এর পবিত্র জীবনবৃত্তান্ত—তাঁর জন্ম,
শৈশব, নবুয়তপূর্ব জীবন, দাওয়াত, সংগ্রাম, নীতি–আদর্শ এবং তাঁর সামগ্রিক চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব।
শিশুদের জন্য সীরাত পাঠের অর্থ শুধু কিছু ঐতিহাসিক সন–তারিখ বা যুদ্ধের ইতিহাস মুখস্থ করা নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো রাসুলুল্লাহ ﷺ কেমন ছিলেন,
তিনি কীভাবে মানুষের সাথে কথা বলতেন,
কীভাবে বিপদে ধৈর্য ধরতেন এবং কীভাবে ভালোবাসতেন—তা উপলব্ধি করে নিজের জীবনে ধারণ করা। সীরাত হলো জীবন্ত কুরআন; যা দেখে একটি শিশু শিখতে পারে একজন শ্রেষ্ঠ মানুষের ব্যবহারিক জীবন কেমন হওয়া উচিত।
শিশুর চরিত্র গঠনে সীরাতের ভূমিকা ও প্রভাব
একটি শিশুর মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে তাত্ত্বিক উপদেশের চেয়ে বাস্তব আদর্শ অনেক বেশি কার্যকর। শিশু যা দেখে,
তা–ই অনুকরণ করে। রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর পবিত্র সীরাত শিশুর সামগ্রিক চরিত্র গঠনে যেভাবে গভীর প্রভাব ফেলে:
১. আদর্শ অনুসরণের মানসিকতা তৈরি
শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই কাউকে না কাউকে নিজের আদর্শ (Role
Model) হিসেবে গ্রহণ করে। বর্তমান মিডিয়া ও সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মের যুগে তারা প্রায়ই কাল্পনিক সুপারহিরোদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। সীরাত আলোচনার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর ব্যক্তিত্বকে শিশুর সামনে জীবন্ত করে তুললে সে কাল্পনিক চরিত্রের বদলে একজন বাস্তব,
সত্য ও ন্যায়পরায়ণ মহামানবকে নিজের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।“ (সূরা আল–আহযাব,
৩৩:২১)
২. সত্যবাদিতা ও আমানতদারি
নবুয়ত লাভের বহু পূর্ব থেকেই মক্কার মানুষ নবীজি ﷺ–কে ‘আল–আমিন’ (বিশ্বস্ত) ও ‘আস–সাদিক’ (সত্যবাদী) উপাধিতে ভূষিত করেছিল। এমনকি যারা তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেছিল, তারাও নিজেদের মূল্যবান সম্পদ তাঁর কাছেই আমানত রাখত। হিজরতের কঠিন রাতেও তিনি হযরত আলী (রা.)-কে সেই আমানত ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন। এই ঘটনাগুলো শিশুকে শেখায়—পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক না কেন, সত্যের পথ ত্যাগ করা যায় না এবং অন্যের আমানত রক্ষা করা আবশ্যক।
৩. দয়া,
সহমর্মিতা ও ক্ষমাশীলতা
নবীজি ﷺ ছিলেন বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ (সূরা আল–আম্বিয়া,
২১:১০৭)। তায়েফে ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে রক্তাক্ত ও আহত হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাদের ধ্বংস চাননি;
বরং তাদের হিদায়াতের জন্য দোয়া করেছেন। মক্কা বিজয়ের দিন পরম শত্রুদের সামনে পেয়েও তিনি ঘোষণা করেছিলেন সাধারণ ক্ষমা। এই ঘটনাগুলো শিশুর মনে প্রতিশোধপরায়ণতার পরিবর্তে ক্ষমা,
সহনশীলতা ও মানুষের প্রতি অগাধ সহমর্মিতার বীজ বুনে দেয়।
৪. বিনয় ও অনাড়ম্বর জীবন
সমগ্র আরবের অবিসংবাদিত নেতা হয়েও রাসুলুল্লাহ ﷺ খেজুরপাতার মাদুরে ঘুমাতেন,
যার দাগ তাঁর পিঠে লেগে থাকত (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯১৩)। তিনি নিজের জুতো নিজে মেরামত করতেন,
বকরির দুধ দোহন করতেন এবং ঘরের কাজে পরিবারকে সাহায্য করতেন। সীরাতের এই দিকগুলো শিশুর মন থেকে অহংকার দূর করে এবং তাকে সহজ–সরল ও বিনয়ী হতে অনুপ্রাণিত করে।
৫. দুর্বল ও অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষা
রাসুলুল্লাহ ﷺ সমাজের এতিম,
দাস, মজুর ও অসহায় মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ছিলেন আপসহীন। তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই যেন তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করা হয় (সুনান ইবনে মাজাহ,
হাদিস: ২৪৪৩)। শিশুদের এই শিক্ষাগুলো দিলে তারা বড় হয়ে সমাজের অবহেলিত মানুষের প্রতি সংবেদনশীল হতে শেখে।
শিশুদের সঙ্গে নবীজি ﷺ–এর আচরণ: প্যারেন্টিংয়ের চিরন্তন পাঠ
অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর জীবন হলো শিশু মনস্তত্ত্ব ও প্যারেন্টিংয়ের শ্রেষ্ঠ পাঠশালা। শিশুদের সঙ্গে তাঁর প্রতিটি আচরণ ছিল ভালোবাসায় পূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ।
শিশুর সঙ্গে রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর আচরণ
- অগাধ ভালোবাসা ও শারীরিক স্নেহ প্রকাশ
- ভুল সংশোধনে চরম কোমলতা ও ধৈর্য
- শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা ও তাকে মর্যাদা দেওয়া
- সুস্থ খেলাধুলা ও শিশুসুলভ আচরণে উৎসাহদান
১. ভালোবাসা ও স্নেহ প্রকাশ
রাসুলুল্লাহ ﷺ শিশুদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং তাদের জড়িয়ে ধরে চুমু খেতেন। একবার এক বেদুইন এসে বলল,
“আপনারা কি শিশুদের চুমু দেন? আমরা তো কখনো দেই না।” রাসুলুল্লাহ ﷺ উত্তর দিয়েছিলেন,
“আল্লাহ যদি তোমার অন্তর থেকে দয়া উঠিয়ে নেন, তবে আমার কী করার আছে?” (সহিহ বুখারি,
হাদিস: ৫৯৯৮)। শিশুদের নিয়মিত ভালোবাসা প্রকাশ করা তাদের মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
২. ভুল সংশোধনে অনন্য কোমলতা
হযরত আনাস (রা.) বলেন,
“আমি দশ বছর রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর খেদমত করেছি। তিনি কখনো আমার কোনো কাজে ‘উফ’ শব্দটুকু করেননি। কখনো বলেননি—তুমি এ কাজ কেন করলে, কিংবা এ কাজ কেন করলে না?” (সহিহ বুখারি,
হাদিস: ৬০৩৮)।
একবার ছোট সাহাবি উমর ইবনে আবি সালামাহ (রা.) খাবার পাত্রের চারপাশ থেকে খাচ্ছিলেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ ধমক না দিয়ে অত্যন্ত নরম গলায় বললেন:
“হে বৎস! আল্লাহর নাম নাও (বিসমিল্লাহ বলো), ডান হাতে খাও এবং তোমার কাছের অংশ থেকে খাও।“
(সহিহ বুখারি,
হাদিস: ৫৩৭৬)
৩. শিশুদের মর্যাদা দেওয়া ও সালাম দেওয়া
হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন,
রাসুলুল্লাহ ﷺ শিশুদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের আগে সালাম দিতেন এবং তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২৪৭)। এতে শিশুরা নিজেকে সম্মানিত ও নিরাপদ মনে করত।
৪. স্বাভাবিক শিশুসুলভ আচরণ ও খেলাধুলাকে সম্মান
নবীজি ﷺ নামাজে সিজদারত থাকা অবস্থায় তাঁর দৌহিত্র হাসান ও হুসাইন (রা.) তাঁর পিঠে চড়ে বসতেন। তিনি শিশুদের বিঘ্ন না ঘটিয়ে সিজদা দীর্ঘ করতেন (সুনান আন–নাসায়ি, হাদিস: ১১৪১)। তিনি কখনো শিশুদের কৃত্রিমভাবে পরিণত বয়স্কদের মতো আচরণ করতে বাধ্য করতেন না।
সীরাত কীভাবে শিশুর নৈতিক শিক্ষাকে বাস্তবসম্মত করে?
সাধারণত শিশুদের শুধু নির্দেশনামূলক উপদেশ দিলে—যেমন “মিথ্যা বলা পাপ“,
“ধৈর্য ধরো“,
“রাগ করো না“—তা তাদের কাছে কিছুটা বিমূর্ত মনে হতে পারে। শিশু যুক্তি বা কঠোর নির্দেশের চেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণে বেশি সাড়া দেয়।
|
নির্দেশনামূলক নৈতিকতা (Abstract) |
সীরাতভিত্তিক বাস্তব শিক্ষা (Concrete) |
|
“অন্যের ক্ষতি করতে নেই।“ |
তায়েফে নবীজি ﷺ–এর ওপর পাথর নিক্ষেপ করার পরও তিনি তাদের ধ্বংসের বদদোয়া না করে হিদায়াতের দোয়া করেছিলেন। |
|
“সব সময় সত্য কথা বলবে।“ |
রাসুলুল্লাহ ﷺ ছোটবেলা থেকেই শত প্রতিকূলতার মাঝেও কখনো অসত্য বলেননি, |
|
“মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করো।“ |
দীর্ঘ ১০ বছর খেদমতে থাকা আনাস (রা.)-কে নবীজি ﷺ কখনো সামান্যতম বিরক্তি প্রকাশ করেননি। |
সীরাতের ঘটনাগুলো নীতিবাক্যকে একটি স্পষ্ট চরিত্রে রূপ দেয়। শিশু তখন মনের মধ্যে চিত্রকল্প তৈরি করে বোঝে—এমন পরিস্থিতিতে আমার কী করা উচিত।
গল্পের মাধ্যমে সীরাত শেখানোর কার্যকর পদ্ধতি
শিশুরা গল্প শুনতে ভালোবাসে। তাই সীরাতকে নীরস ইতিহাসের মতো না পড়িয়ে আকর্ষণীয় গল্পের আকারে তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি:
- নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা: কোনো ধরনের কাল্পনিক গল্প বা দুর্বল ও ভিত্তিহীন বর্ণনা রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর নামে চালানো যাবে না।
- সহজ ও জীবন্ত ভাষা: শিশুর বয়স অনুযায়ী ভাষা সহজ করতে হবে, তবে মূল ঐতিহাসিক সত্য অপরিবর্তিত রাখতে হবে।
- সংলাপ ও অনুভূতি ফুটিয়ে তোলা: ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট ও অনুভূতির দিকটি কোমলভাবে প্রকাশ করা,
যাতে শিশুর মনে চরিত্রগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জন্মায়। - কৌতূহল জাগানো: গল্প বলা শেষে শিশুকে প্রশ্ন করার সুযোগ দিতে হবে, যেমন: “তোমার কি মনে হয়,
নবীজি ﷺ কেন এমন করেছিলেন?”
শুধু সীরাত পাঠ নয়,
বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ
সীরাত চর্চার আসল লক্ষ্য তখনই অর্জিত হয়,
যখন তা শিশুর দৈনন্দিন আচরণে প্রকাশ পায়। অভিভাবক হিসেবে আমাদের লক্ষ্য হবে প্রতিটি শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব জীবনের একটি সংযোগ স্থাপন করা।
- সত্য বলার পর প্রশংসা: শিশু কোনো ভুলের কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করলে তাকে বকা না দিয়ে সত্য বলার জন্য প্রশংসা করুন এবং নবীজি ﷺ–এর সত্যবাদিতার কথা মনে করিয়ে দিন।
- ক্ষমা চাওয়ার অভ্যাস: নিজের কোনো ভুলে শিশু কষ্ট পেলে তাকে সরি বলা এবং শিশু ভুল করলে তাকে ক্ষমা করতে শেখানো।
- পশুপাখি ও পরিবেশের প্রতি যত্ন: নবীজি ﷺ বিড়ালকে কষ্ট দেওয়া থেকে নিষেধ করেছেন এবং গাছের পাতা অপ্রয়োজনে ছেঁড়াও বারণ করেছেন। শিশুকে ঘরের গাছের যত্ন নিতে এবং প্রাণীর প্রতি সদয় হতে শেখান।
- প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া: প্রতিবেশীর বাসায় খাবার পাঠানোর যে সুন্নাহ রয়েছে,
তা শিশুকে দিয়ে করানো যেতে পারে। - দরিদ্রদের দান: নিজের হাত দিয়ে পথশিশু বা ভিক্ষুককে খাবার বা অর্থ দিতে শিশুকে উৎসাহিত করা।
অভিভাবক ও শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
শিশুর অন্তরে সীরাতের আলো প্রজ্বলিত করার মূল কারিগর হলেন পিতা–মাতা এবং শিক্ষকেরা।
(১) নিজেরা নিয়মিত সীরাত অধ্যয়ন করা: বাবা–মা নিজে সীরাত না পড়লে সন্তানকে তা শেখানো সম্ভব নয়। পরিবারের সবাই মিলে নিয়মিত সীরাত পাঠের আসর করা উচিত।
(২) মুখস্থনির্ভরতা পরিহার করা: সীরাতকে ক্লাসের মুখস্থবিদ্যার মতো উপস্থাপন না করে অনুধাবনের বিষয় হিসেবে তুলে ধরা দরকার।
(৩) প্রশ্নের স্বাধীন সুযোগ দেওয়া: সীরাতের কোনো ঘটনা নিয়ে শিশুর মনে কৌতূহল বা প্রশ্ন জাগলে তা ধমক দিয়ে বন্ধ না করে স্নেহভরে বুঝিয়ে দেওয়া উচিত।
(৪) জীবনাচরণে প্রতিফলন ঘটানো:
অভিভাবকের নিজের আচরণ যদি নবীজি ﷺ–এর আদর্শের বিপরীত হয়, তবে সন্তান সীরাতের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা অনুভব করবে না।
বয়সভেদে সীরাত শেখানোর রূপরেখা
শিশুর বয়স ও মানসিক বিকাশের স্তরের ওপর ভিত্তি করে সীরাতের বিষয়বস্তু নির্বাচন করা প্রয়োজন।
শিশুর বয়সভেদে সীরাত শিক্ষা
৪–৬ বছর : নবীজির মমতা, পরিবার, প্রাণীপ্রেম ও সহজ গল্প
৭–৯ বছর : সত্যবাদিতা, সততা, নামাজ ও সহমর্মিতার শিক্ষা
১০–১২ বছর : নবুয়তের সংগ্রাম,
সাহাবিদের ত্যাগ ও সহনশীলতা
কিশোর বয়স : নেতৃত্ব,
মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমকালীন সংকট সমাধান
৪ থেকে ৬ বছর (শৈশব স্তর)
- ফোকাস: নবীজি ﷺ–এর মমতা,
পশু–পাখির প্রতি ভালোবাসা, শিশুদের প্রতি ভালোবাসা। - পদ্ধতি: ছোট ছোট গল্প,
রঙিন ছবিযুক্ত ইসলামিক বই এবং অডিও–ভিডিও উপস্থাপনা।
৭ থেকে ৯ বছর (প্রাথমিক স্তর)
- ফোকাস: রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর শৈশব,
সত্যবাদিতা, আমানতদারি, পিতা–মাতার সেবা এবং সহজ সুন্নাহসমূহ (যেমন: ডান হাতে খাওয়া,
সালাম দেওয়া)। - পদ্ধতি: প্রশ্নোত্তরমূলক আলোচনা,
দৈনিক জীবনের আচরণের সাথে সীরাতের তুলনা।
১০ থেকে ১২ বছর (প্রাক–কৈশোর স্তর)
- ফোকাস: হিলফুল ফুজুল,
মক্কার দাওয়াত, তায়েফের ধৈর্য,
মদিনায় হিজরত এবং সাহাবিদের আত্মত্যাগ। - পদ্ধতি: শিক্ষণীয় বই পড়া,
সংক্ষিপ্ত কুইজ এবং ছোট ছোট দলগত আলোচনা।
কিশোর বয়স (১৩+ বছর)
- ফোকাস: রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর নেতৃত্বগুণ,
কূটনৈতিক প্রজ্ঞা, সামাজিক ন্যায়বিচার,
সংকট নিরসনের পদ্ধতি এবং মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তা। - পদ্ধতি: গভীর বিশ্লেষণধর্মী সীরাত গ্রন্থ অধ্যয়ন,
বর্তমান জীবনের সমস্যার সাথে সীরাতের সমাধান মেলানো।
অভিভাবকদের জন্য বাস্তবমুখী করণীয়
- সপ্তাহে অন্তত দুই দিন নির্দিষ্ট সময়ে পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে সীরাত পাঠের আসর করুন।
- ঘরে একটি ছোট ইসলামিক কর্নার তৈরি করুন, যেখানে শিশুদের উপযোগী সীরাতের বই সাজানো থাকবে।
- উপহার হিসেবে খেলনার পাশাপাশি আকর্ষণীয় সীরাত ও সাহাবিদের জীবনীমূলক বই দিন।
- শিশুর প্রতিটি ভালো আচরণের সাথে রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর সুন্নাহর সম্পর্ক বুঝিয়ে দিন।
- সন্তান কোনো মানবিক কাজ করলে (যেমন কাউকে সাহায্য করা) তার প্রশংসা করুন।
- রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দোয়া ও আদবগুলো খেলার ছলে মুখস্থ করান।
আমরা আমাদের সন্তানকে কেবল পার্থিব জীবনে সফল দেখতে চাই না;
বরং চাই সে হয়ে উঠুক একজন ভালো মানুষ,
দায়িত্বশীল নাগরিক এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ–এর প্রিয় বান্দা। বর্তমান অস্থির সমাজে শিশুর মন ও চরিত্রের সুরক্ষায় সীরাতে রাসুল ﷺ–এর চেয়ে বড় কোনো পাথেয় হতে পারে না। আসুন, সীরাতের আলোয় আমাদের সন্তানদের অন্তরকে আলোকিত করি।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. শিশুকে কোন বয়স থেকে সীরাত শেখানো শুরু করা উচিত?
শিশুর কথা বলা ও বোঝার বয়স (আনুমানিক ৩–৪ বছর) থেকেই ছোট ছোট ঘটনা ও ভালোবাসার গল্পের মাধ্যমে সীরাত শিক্ষা শুরু করা যায়।
২. শিশুরা কি কাল্পনিক সুপারহিরোর চেয়ে সীরাত বেশি পছন্দ করবে?
হ্যাঁ, যদি রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর বীরত্ব, সততা ও মানুষের প্রতি দয়ার বাস্তব ঘটনাগুলো শিশুর উপযোগী প্রাণবন্ত ভাষায় গল্পের মতো করে উপস্থাপন করা যায়।
৩. শিশুদের সীরাত শেখাতে কোন ধরনের বই নির্বাচন করা উচিত?
সহজ ভাষার, রঙিন চিত্রসংবলিত (চেহারা ছাড়া) এবং নির্ভরযোগ্য ও সহিহ ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে রচিত বই নির্বাচন করা উচিত।
৪. মুখস্থ না করিয়ে কীভাবে সীরাতের শিক্ষা শিশুর আচরণে আনা যায়?
নবীজি ﷺ–এর বাস্তব জীবনের ছোট ছোট আদব—যেমন সালাম দেওয়া, খাবার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা ও ডান হাত ব্যবহার করা—নিজেরা চর্চা করে শিশুকে অভ্যস্ত করাতে হবে।
৫. সীরাত শিক্ষায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কী হতে পারে?
শ্রেণিকক্ষে নৈতিক শিক্ষা ক্লাসে তাত্ত্বিক উপদেশের পাশাপাশি সীরাতের প্রাসঙ্গিক ঘটনা আলোচনা করা এবং শিশুদের সহমর্মিতা ও সত্যবাদিতা চর্চায় উৎসাহিত করা।

