লেখক: শিশুশিক্ষা ও প্যারেন্টিং গবেষক মুফতি আব্দুল্লাহ আল হাদী [এম.এ, ঢাবি] |
পরিচালক: তাকওয়া শিশু একাডেমি ও মাদরাসাতুল ঈমান, ঢাকা।
![]() |
| Mufti abdullah al hadi |
ভূমিকা
সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও আদর্শ শিক্ষার নিশ্চয়তা দিতে অভিভাবকেরা তাঁদের সাধ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেছে নেন। তবে অনেক সময় ভালো শিক্ষার আকাঙ্ক্ষায় আমরা এমন এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশের স্কুল নির্বাচন করি, যা আমাদের পারিবারিক জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে শিশু অজান্তেই সহপাঠীদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রার সঙ্গে নিজের পরিবারকে তুলনা করতে শুরু করে। সেখান থেকে জন্ম নেয় অপ্রয়োজনীয় হীনম্মন্যতা ও পরিচয়ের সংকট। এই আর্টিকেলে একটি বাস্তব ঘটনার আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে—কীভাবে কেবল প্রতিষ্ঠানের বাহ্যিক জৌলুস বা ব্র্যান্ড ভ্যালু নয়, বরং পারিবারিক বাস্তবতা ও সন্তানের মানসিক স্বস্তির ভারসাম্য রক্ষা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা জরুরি।
১. “মা, আমরা এত গরিব কেন?”—একটি নিষ্পাপ প্রশ্নের গভীর ক্ষত
“মা, আমরা এত গরিব কেন?”
“আমাদের গাড়ি নেই কেন?”
“আমাদের ঢাকায় নিজস্ব বাড়ি নেই কেন?”
এক বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে এক সাত-আট বছরের ছোট্ট মেয়ে তার মাকে খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে প্রশ্নগুলো করল। কথাগুলো শুনে যে কোনো বাবা-মায়ের বুকের ভেতরটা মুহূর্তের জন্য কেঁপে ওঠার কথা। যে পরিবারটি হয়তো মাসের পর মাস মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সন্তানকে শহরের অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠানে পড়াচ্ছে, যাতে সে ভালো কিছু শেখে, ভালো মানুষের সান্নিধ্যে থাকে—তাদের কাছে এই প্রশ্ন কোনো সাধারণ কৌতূহল নয়; বরং এক গভীর মানসিক ধাক্কা।
প্রশ্নটি শুনে পরিবারটি প্রথমে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোনো অসচ্ছলতা বা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে তারা বাস করে না। বরং সমাজে একটি সম্মানজনক, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও সুন্দর মধ্যবিত্ত জীবনই তাদের। তাহলে একটি শিশুর নিষ্পাপ মনে কেন এই ধারণার জন্ম হলো যে তারা ‘গরিব’? কেন তার মনে হলো তাদের পরিবার অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে উন্মোচিত হয় এক অদৃশ্য মানসিক সংকটের বাস্তবতা, যা আজ বহু সচেতন পরিবারের নীরব সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২. প্রতিদিনের দৃশ্যপট ও একটি শিশুর অভিজ্ঞতা
ঘটনাটি ঢাকার উত্তরায় বসবাসরত এক পরিচিত পরিবারের। পরিবারের কর্তা ও গিন্নি দুজনেই শিক্ষিত, মার্জিত এবং ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী। পেশাগত ও আর্থিকভাবে তারা বেশ স্থিতিশীল। সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ, আদর্শ চরিত্র গঠন এবং আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ের কথা ভেবে তারা মেয়েটিকে উত্তরার একটি অত্যন্ত নামিদামি ও মানসম্মত ইসলামিক স্কুলে ভর্তি করান।
প্রতিষ্ঠানটির পড়ালেখার মান চমৎকার, শিক্ষকদের যত্ন প্রশংসনীয়। কিন্তু সেই স্কুলের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আসে সমাজের উচ্চবিত্ত ও শিল্পপতি পরিবার থেকে।
মেয়েটির প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা যদি পর্যবেক্ষণ করা যায়, তবে দেখা যাবে—
-
যাতায়াতের বৈপরীত্য: প্রতিদিন সকালে স্কুলের গেটে যখন সারি সারি ব্যক্তিগত বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামে, ড্রাইভার এসে গাড়ির দরজা খুলে দেয়, তখন এই ছোট্ট মেয়েটি তার মায়ের সঙ্গে একটি সাধারণ রিকশা থেকে নামে।
-
টিফিন ও ভোগপণ্য: টিফিনের বিরতিতে অনেক সহপাঠী দামি বিদেশি চকোলেটের বাক্স, আকর্ষণীয় প্যাকেটের স্ন্যাকস নিয়ে আসে এবং অন্যদের মাঝে বিলাতে থাকে। মেয়েটির মা-ও তার জন্য অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর নাস্তা তৈরি করে দেন। কিন্তু সেই ঘরোয়া নাস্তার আবেদন অন্য শিশুদের চকচকে ব্র্যান্ডের মোড়কের কাছে ম্লান হয়ে যায়।
-
সহপাঠীদের গল্প: ছুটির পর বান্ধবীদের মুখে শোনা যায় তাদের বিশাল ফ্ল্যাট, ব্যক্তিগত গাড়ি, কিংবা দামি খেলনার গল্প।
মেয়েটির পরিবার কোনোভাবেই অভাবী নয়। কিন্তু সে প্রতিদিন এমন এক ক্ষুদ্র সামাজিক বলয়ে কয়েক ঘণ্টা কাটাচ্ছে, যেখানে তার সহপাঠীদের গড় জীবনযাত্রার মান তার পরিবারের চেয়ে অনেক ওপরে। শিশুটি তার অজান্তেই প্রতিদিন নিজেকে অন্যদের চেয়ে কম সম্পদশালী হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।
৩. শিশুর চোখে ‘ধনী’ ও ‘গরিব’: দৃশ্যমান বিষয়ের সহজ সমীকরণ
একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের কাছে অর্থনীতির সংজ্ঞা অনেক জটিল। বড়রা বোঝেন—অর্থের চেয়ে মানসিক শান্তি, ঋণমুক্ত জীবন, পারিবারিক বন্ধন ও হালাল উপার্জনের বরকত কত বেশি মূল্যবান। কিন্তু একটি ৭ থেকে ৯ বছরের শিশুর মস্তিষ্ক অতটা জটিলভাবে সমাজবিজ্ঞান বিশ্লেষণ করতে পারে না।
শিশুর জগৎ অত্যন্ত প্রত্যক্ষ ও ইন্দ্রিয়নির্ভর। যা সে চোখে দেখে, তা দিয়েই সে মূল্যায়ন করে। তার সহজ সমীকরণটি দাঁড়ায় এমন:
-
যার ব্যক্তিগত গাড়ি আছে = সে ধনী।
-
যার ঢাকায় বড় বাড়ি বা ফ্ল্যাট আছে = সে সফল।
-
যে প্রতিদিন দামি ব্র্যান্ডেড চকোলেট আনে = সে বড়লোক।
-
আর যার এগুলো নেই = সে গরিব বা পিছিয়ে পড়া।
এই সরলীকরণ শিশুর দোষ নয়। এটি তার বয়সোচিত স্বাভাবিক উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন এই দৃশ্যমান পার্থক্যের কারণে শিশুটি নিজের আত্মপরিচয় নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যায়।
৪. সামাজিক তুলনা কীভাবে শিশুর আত্মপরিচয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে?
শিশুরা তাদের চারপাশের পরিবেশ ও সঙ্গীদের কাছ থেকেই নিজেদের একটি মানসিক প্রতিচ্ছবি তৈরি করে। যখন একজন শিশু প্রতিনিয়ত নিজেকে অন্যদের তুলনায় বস্তুগতভাবে পিছিয়ে থাকতে দেখে, তখন তার মধ্যে কিছু গভীর মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে:
ক. আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসের সংকট
শিশু ভাবতে শুরু করে, তার বন্ধুদের যে গুরুত্ব আছে, ক্লাসে তার হয়তো সেই গুরুত্ব নেই। সে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারে এবং ভাব প্রকাশে সংকোচ বোধ করতে পারে।
খ. অপ্রয়োজনীয় হীনম্মন্যতা
নিজের পরিবার, বাবা-মায়ের পেশা বা নিজেদের সাধারণ জীবনযাত্রাকে সে অন্য সবার চেয়ে ‘ছোট’ ভাবতে শুরু করে। অনেক সময় পরিবারের প্রতি এক ধরনের অবচেতন অসন্তোষ তৈরি হয়।
গ. ভোগবাদী মানসিকতা ও ‘আমারও এটা চাই’ প্রবণতা
সহপাঠীদের অনুকরণে সে এমন সব জিনিস বা সুযোগ-সুবিধা দাবি করতে থাকে, যা হয়তো তার পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সঙ্গে যায় না। না পেলে সে নিজেকে বঞ্চিত মনে করে।
ঘ. সম্পর্কের দূরত্বের সূচনা
বাবা-মা কেন তাকে বন্ধুদের মতো গাড়ি দিতে পারছেন না বা বড় বাড়ি দিতে পারছেন না—এই না-বোঝার কারণে বাবা-মায়ের প্রতি অযৌক্তিক রাগ বা ক্ষোভের জন্ম হতে পারে।
৫. অভিভাবকের ভুল: ভালো নিয়ত কিন্তু ভুল বাস্তবতা
অনেক অভিভাবক মনে করেন, সন্তানকে নিজের সামর্থ্যের চেয়েও এক ধাপ ওপরে থাকা সামাজিক পরিবেশে রাখলে সে জীবনে বড় হওয়ার অনুপ্রেরণা পাবে।
একজন অভিভাবকের চিন্তা থাকে অত্যন্ত পবিত্র ও দূরদর্শী:
-
“আমার সন্তান সেরা আদব ও নৈতিকতা শিখুক।”
-
“সে ভালো ঘরের সন্তানদের সঙ্গে বড় হোক।”
-
“শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে আমি কোনো আপস করব না, প্রয়োজনে নিজের খরচ কমাব।”
অভিভাবকের এই ত্যাগের মানসিকতা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—ভালো নিয়ত একা কোনো সিদ্ধান্তের সঠিকতার নিশ্চয়তা দেয় না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল একটি শ্রেণিকক্ষ নয়; এটি একটি শিশুর দ্বিতীয় সমাজ। সেই সমাজের অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ যদি শিশুর ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তবে সেরা শিক্ষার সুফলটুকুও হীনম্মন্যতার নিচে চাপা পড়ে যেতে পারে।
৬. ভালো স্কুল মানেই কি উপযুক্ত সিদ্ধান্ত?
কোনো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শহরের সেরা হতে পারে, কিন্তু সেই স্কুলটিই আপনার নির্দিষ্ট সন্তানের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে ‘উপযুক্ত’ কি না—তা গভীরভাবে ভাবার বিষয়।
একটি স্কুল নির্বাচনের সময় কেবল স্কুলের নাম ও পরীক্ষার ফলাফল নয়, বরং সামগ্রিক বাস্তবতার একটি সমন্বিত তালিকা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি:
৭. ‘নিজের সামাজিক স্তর’ বলতে আসলে কী বোঝায়?
এখানে ‘নিজের স্তর’ বা ‘পারিবারিক সামর্থ্য’ কথাটি দিয়ে কোনোভাবেই মানুষের মানবিক মর্যাদার পার্থক্য বোঝানো হচ্ছে না।
ইসলাম ও সার্বজনীন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী সব মানুষ সমান। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা কোনো অগৌরবের বিষয় নয়, আবার বিপুল সম্পদের মালিক হওয়াও শ্রেষ্ঠত্বের একক প্রমাণ নয়।
এখানে ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবেশ’ বলতে বোঝানো হয়েছে—যেখানে একটি শিশু তার পরিবারের স্বাভাবিক জীবনধারা নিয়ে কোনো ধরনের কৃত্রিম লজ্জা বা অস্বস্তি ছাড়া স্বাচ্ছন্দ্যে শ্বাস নিতে পারে।
যেখানে রিকশায় স্কুলে যাওয়া কোনো ব্যতিক্রমী দৃশ্য নয়, যেখানে ঘরোয়া সাধারণ টিফিন কোনো কৌতুকের বিষয় নয়, এবং যেখানে পারিবারিক আয়ের ভিত্তিতে শিশুদের মধ্যে অদৃশ্য দেয়াল গড়ে ওঠে না।
৮. সম্পদ নয়, সাফল্যের আসল মাপকাঠি গড়ে তোলা
শিশুকে ছোটবেলা থেকেই বোঝাতে হবে যে মানুষের আসল মর্যাদা তার গাড়ির মডেল, বাড়ির আয়তন বা কাপড়ের ব্র্যান্ডে নয়; মানুষের আসল সৌন্দর্য তার অন্তরে, চরিত্রে ও ব্যবহারে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন:
“তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক তাকওয়াবান (সদাচারী ও পরহেজগার)।” (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১৩)
নবী করিম (সা.) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বৈষয়িক দৃষ্টিভঙ্গির ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
“আল্লাহ তাআলা তোমাদের বাহ্যিক চেহারা ও ধন-সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও তোমাদের আমলের দিকে তাকান।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪)
শিশুকে সাফল্যের গল্প শোনাতে হবে সততা, ত্যাগ, অধ্যবসায় এবং জ্ঞানের উদাহরণ দিয়ে—ধনসম্পদের প্রাচুর্য দিয়ে নয়।
৯. সন্তান যখন বলবে—“মা, আমরা কি গরিব?”: যেভাবে উত্তর দেবেন
এমন প্রশ্নের মুখে শিশুকে ধমক দেওয়া, লজ্জা দেওয়া কিংবা অতি-আবেগপ্রবণ হয়ে বন্ধুদের পরিবার নিয়ে কটূক্তি করা যাবে না। অত্যন্ত শান্ত, মমতাময়ী ও শিশুবান্ধব ভাষায় বাস্তবতা বুঝিয়ে বলতে হবে।
একটি সুন্দর ও বাস্তবমুখী সংলাপের উদাহরণ:
“মামণি/বাবা, কাছে এসো। তুমি কি জানো গরিব কারা? যাদের থাকার জায়গা নেই, খাবার নেই, পড়ার সুযোগ নেই। আল্লাহ কি আমাদের সুন্দর একটি ঘর দেননি? আলহামদুলিল্লাহ, আমরা প্রতিদিন পেট ভরে পুষ্টিকর খাবার খাচ্ছি, তুমি এত সুন্দর একটা স্কুলে পড়ছ।
আল্লাহ সবাইকে একরকম করে বানান না। কারও হয়তো গাড়ি আছে, কিন্তু অন্য অনেক কিছু নেই। আবার আমাদের গাড়ি নেই, কিন্তু আমাদের সুন্দর একটা সুখী পরিবার আছে। গাড়ি বা দামি চকোলেট কোনো মানুষকে ভালো বা বড় বানায় না; যে সবার সাথে ভালো ব্যবহার করে, সত্যি কথা বলে এবং পড়াশোনায় মন দেয়, সেই আসল ভালো মানুষ। আল্লাহ আমাদের যা দিয়েছেন, তাতে আমরা অনেক খুশি, তাই না?”
এভাবে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে কথা বললে শিশুর মনের সংশয় দূর হয় এবং সে নিজের পরিবার নিয়ে গর্ব করতে শেখে।
১০. অভিভাবকদের জন্য বাস্তবমুখী করণীয়
সন্তানের মানসিক বিকাশ সুস্থ রাখতে এবং সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করতে অভিভাবকদের করণীয়:
(১) প্রশ্নের গভীরতা উপলব্ধি করা: শিশু যখন আর্থিক বিষয়ে প্রশ্ন করে, তখন তাকে এড়িয়ে না গিয়ে তার উৎস খুঁজে বের করুন।
(২) লজ্জা বা ধমক পরিহার করা: “এসব ফালতু কথা কোথায় শিখলে?” বলে শিশুর কৌতূহল দমন করবেন না।
(৩) অন্য পরিবারকে খাটো না করা: সহপাঠীদের ধনী পরিবার সম্পর্কে হিংসাত্মক বা অবমাননাকর মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।
(৪) কৃত্রিম প্রতিযোগিতায় না নামা: সন্তানকে সন্তুষ্ট করতে নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ব্র্যান্ডের পণ্য বা গ্যাজেট কিনে দেওয়ার ফাঁদে পা দেবেন না।
(৫) কৃতজ্ঞতাবোধের চর্চা করানো: প্রতিদিন পরিবারের সবাইকে নিয়ে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতগুলোর জন্য শোকর আদায়ের (আলহামদুলিল্লাহ বলার) অভ্যাস গড়ে তুলুন।
(৬) চরিত্র ও গুণের প্রশংসা করা: সন্তান ভালো রেজাল্ট বা ভালো আচরণ করলে প্রশংসা করুন; সে কী পরল বা কী খেল তা দিয়ে তার মূল্যায়ন করবেন না।
(৭) সামাজিক সমতার চর্চায় রাখা: বিভিন্ন সামাজিক স্তরের মানুষের সঙ্গে শিশুকে মেলামেশা করতে দিন, যাতে সে সব মানুষকে সম্মান করতে শেখে।
(৮) খোলামেলা পারিবারিক আলোচনা: বাবা-মায়ের পরিশ্রম ও হালাল উপার্জনের গুরুত্ব গল্পচ্ছলে সন্তানের সঙ্গে শেয়ার করুন।
(৯) পারিপার্শ্বিকতার নিয়মিত খোঁজ রাখা: ক্লাসে শিশু কোনো ধরনের অদৃশ্য বৈষম্য বা বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সতর্ক থাকুন।
(১০) প্রয়োজনে পরিবেশ পরিবর্তন: যদি দেখা যায় পরিবেশের কারণে শিশুর মানসিক ক্ষতি বেশি হচ্ছে, তবে বাস্তবসম্মত বিকল্প ভাবুন।
১১. কখন স্কুল পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করবেন?
শুধু সহপাঠীরা সচ্ছল পরিবারের—কেবল এই কারণেই স্কুল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। তবে নিচের লক্ষণগুলো যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বিষয়টি গভীরভাবে মূল্যায়ন করা দরকার:
-
শিশু যদি নিয়মিত নিজেকে অন্য সবার চেয়ে হীন বা তুচ্ছ মনে করে এবং তার আত্মবিশ্বাস ক্রমাগত কমতে থাকে।
-
যদি সে ক্লাসের বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে না পেরে একা ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
-
সহপাঠীদের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে যদি পরিবারের প্রতি তার আচরণে অবাধ্যতা বা ক্ষোভের মাত্রা বাড়তে থাকে।
-
পড়াশোনার আনন্দের চেয়ে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার মানসিক অস্বস্তি ও আতঙ্ক যদি বড় হয়ে দাঁড়ায়।
-
শিক্ষকরা যদি ধনী-দরিদ্র শিশুদের মাঝে দৃশ্যমান বা অদৃশ্য কোনো পক্ষপাতমূলক আচরণ করেন।
এমন পরিস্থিতিতে অপেক্ষাকৃত ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক পরিবেশের কোনো প্রতিষ্ঠানে সন্তানকে স্থানান্তর করা তার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অনেক বেশি কল্যাণকর হতে পারে।
উপসংহার
অভিভাবক হিসেবে আমাদের মনে রাখতে হবে—সন্তানকে বড় মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মূল চাবিকাঠি কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; বরং একটি সুস্থ, চাপমুক্ত ও ভালোবাসাপূর্ণ পরিবেশ।
আমরা যেন সন্তানের তথাকথিত উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পেছনে ছুটতে গিয়ে তার বর্তমান শৈশবকে হীনম্মন্যতার অন্ধকারে ঠেলে না দিই। তাকে এমন পরিবেশে বড় হতে দিন, যেখানে সে নিজের অবস্থান নিয়ে লজ্জিত হবে না, বরং নিজের পরিবারের ত্যাগের মূল্য বুঝবে।
সন্তানকে আদর্শ মানুষ করার জন্য তার সব অযৌক্তিক চাওয়া পূরণ করতে হয় না; বরং যা আছে তার প্রকৃত মূল্য বুঝতে শেখানোটাই হলো প্রকৃত প্যারেন্টিং।


