লেখক: শিশুশিক্ষা ও প্যারেন্টিং গবেষক মুফতি আব্দুল্লাহ আল হাদী [এম.এ, ঢাবি] |
পরিচালক: তাকওয়া শিশু একাডেমি ও মাদরাসাতুল ঈমান, ঢাকা।
![]() |
| Mufti Abdullah Al Hadi |
মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ–এর জীবনাদর্শ প্রতিটি মানুষের ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির একমাত্র সোপান। জীবনের জটিল পথপরিক্রমায় মানুষ যখন সঠিক দিশা হারিয়ে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হয়,
তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর সুন্নাহ ও সুমহান চরিত্রই আমাদের সামনে তুলে ধরে আলোকময় পথের সন্ধান। তিনি কেবল একজন ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না, বরং ছিলেন একাধারে সফল সমাজসংস্কারক, ন্যায়পরায়ণ শাসক, স্নেহশীল পিতা এবং সর্বোত্তম স্বামী। তাই ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসুল ﷺ–এর উত্তম আদর্শ ধারণ করা প্রতিটি মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব।
বর্তমান বস্তুবাদী সমাজে নীতি–নৈতিকতার সংকট যখন চরমে, তখন প্রিয় নবীজি ﷺ–এর জীবনাচরণ জানা ও তা নিজের এবং সন্তানের জীবনে বাস্তবায়ন করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর পুরো জীবনই ছিল পবিত্র কুরআনের বাস্তব রূপ। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং মানবীয় গুণাবলি কিয়ামত পর্যন্ত অনাগত সকল মানুষের জন্য অনুসরণীয় ও অনুকরণীয়।
১. রাসুল ﷺ কেন আমাদের সর্বোত্তম আদর্শ
আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে অসংখ্য নবী ও রাসুল প্রেরণ করেছেন মানুষকে সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য। তবে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ–কে পাঠিয়েছেন সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বজনীন রহমত হিসেবে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন:
“আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।”
— সূরা আল–আম্বিয়া: ১০৭
মহানবী ﷺ–এর জীবনাদর্শ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়ার অন্যতম কারণ হলো তাঁর জীবনের সামগ্রিকতা। তাঁর জীবনে এমন কোনো ক্ষেত্র নেই,
যেখানে তিনি সর্বোত্তম পথ দেখাননি। একজন এতিম বালক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপ্রধান পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি স্তরের সফল বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল। প্রতিকূল পরিস্থিতি, চরম শত্রুতা ও অপমানের মুখেও তিনি সর্বদা সত্য, ন্যায় ও শান্তির পথেই অবিচল থেকেছেন। তাঁর এই অতুলনীয় চরিত্র ও পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থাই তাঁকে মানব ইতিহাসের সর্বোত্তম আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আরও পড়ুন

২. সূরা আল–আহযাবের ২১ নম্বর আয়াতের শিক্ষা ও তাৎপর্য
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে প্রিয় নবীজি ﷺ–এর আদর্শ অনুসরণের নির্দেশ দিয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ইরশাদ করেছেন:
“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ—তার জন্য,
যে আল্লাহ ও পরকালের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।”
— সূরা আল–আহযাব: ২১
আয়াতের গভীর শিক্ষা
- উসওয়াতুন হাসানাহ (উত্তম আদর্শ): আরবি ‘উসওয়াহ’ শব্দের অর্থ এমন এক নিখুঁত উদাহরণ, যা কোনো দ্বিধা ছাড়া অনুসরণ করা যায়। রাসুল ﷺ–এর চরিত্র হলো তেমনই এক আদর্শ।
- পরকালের প্রত্যাশা: যে ব্যক্তি কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত প্রত্যাশা করে,
তার জন্য মহানবী ﷺ–এর জীবন অনুকরণ করা বাধ্যতামূলক। - যিকিরের সাথে সম্পর্ক: আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহকে বেশি স্মরণ করে,
তারাই নবীজি ﷺ–এর আদর্শ সঠিকভাবে ধারণ করতে পারে।
খন্দকের যুদ্ধের চরম সংকটময় মুহূর্তে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তীব্র শীত, ক্ষুধা ও শত্রুপক্ষের অবরোধের মাঝেও রাসুলুল্লাহ ﷺ যেভাবে সাহাবিদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পরিখা খনন করেছিলেন এবং অবিচল আস্থা রেখেছিলেন,
তা প্রমাণ করে যে বিপদের দিনেও নবীজির পথই সবচেয়ে বড় ভরসা।
৩. রাসুল ﷺ–এর উত্তম চরিত্র ও নৈতিকতা
রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর আখলাক বা চরিত্র ছিল এক অনুপম বিস্ময়। আল্লাহ তাআলা নিজেই তাঁর চরিত্রের প্রশংসা করে বলেছেন:
“নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।”
— সূরা আল–ক্বলম: ৪
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-কে যখন নবীজি ﷺ–এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল,
তখন তিনি বলেছিলেন: “পবিত্র কুরআনই ছিল তাঁর চরিত্র।” (সহিহ মুসলিম)
অর্থাৎ পবিত্র কুরআনে যেসব উত্তম গুণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, রাসুল ﷺ ছিলেন সেগুলোর জীবন্ত রূপ। তিনি কখনো অন্যায় কথা বলতেন না,
কাউকে উপহাস করতেন না এবং কর্কশ ভাষায় কথা বলতেন না। তাঁর হাঁটাচলা,
কথাবার্তা ও মানুষের সাথে মেলামেশায় ফুটে উঠত বিনয় ও পবিত্রতা।
৪. সত্যবাদিতা ও আমানতদারি
নবুয়ত প্রাপ্তির বহু পূর্ব থেকেই মক্কার কাফের–মুশরিকরা রাসুল ﷺ–কে ‘আল–আমিন’ (বিশ্বস্ত) এবং ‘আস–সাদিক’ (সত্যবাদী) উপাধিতে ভূষিত করেছিল। এমনকি যারা তাঁর নবুয়তের চরম বিরোধিতা করেছিল,
তারাও তাদের মূল্যবান সম্পদ রাসুল ﷺ–এর কাছেই আমানত রাখত।
আরও পড়ুন

মদিনায় হিজরতের রাতে নিজের প্রাণের চরম ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তিনি হযরত আলী (রা.)-কে নির্দেশ দিয়ে যান যেন মক্কার কাফেরদের আমানত যথাযথভাবে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, আমানতদারির ক্ষেত্রে কোনো শত্রুতার স্থান ইসলামের দৃষ্টিতে নেই। আজকের যুগে সততা ও বিশ্বস্ততার যে সংকট চারদিকে দেখা যায়, তার একমাত্র সমাধান রয়েছে প্রিয় নবী ﷺ–এর এই নীতিতে।
৫. দয়া, ক্ষমাশীলতা ও মানুষের প্রতি কোমল আচরণ
রাসুলুল্লাহ ﷺ ছিলেন ক্ষমার মূর্ত প্রতীক। জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি চরম শত্রুদের প্রতিও পরম করুণা প্রদর্শন করেছেন।
- তায়েফের ময়দানে ক্ষমা: তায়েফের লোকেরা যখন তাঁকে রক্তাক্ত করেছিল,
তখন পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা এসে জনপদ দুটিকে ধ্বংস করে দেওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু দয়ার নবী ﷺ
বলেছিলেন, “না, আমি আশা করি এদের বংশধরদের মধ্যে কেউ না কেউ আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেবে।” - মক্কা বিজয়ের ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত: মক্কা বিজয়ের দিন রাসুল ﷺ প্রতিশোধ নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা রাখা সত্ত্বেও কুরাইশদের উদ্দেশে বলেছিলেন,
“আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই;
যাও, তোমরা সবাই মুক্ত।”
নবীজি ﷺ কখনো নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রতিশোধ নেননি। তাঁর এই অসীম দয়া ও ক্ষমাশীলতাই লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয় জয় করে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে টেনে এনেছিল।
৬. শিশুদের প্রতি রাসুল ﷺ–এর ভালোবাসা ও স্নেহময় আচরণ
শিশুদের প্রতি মহানবী ﷺ–এর ভালোবাসা ছিল অতুলনীয়। আজকের শিশু বিশেষজ্ঞদের অনেক উন্নত ধারণার চেয়েও হাজার বছর আগে রাসুল ﷺ শিশুদের মানসিক বিকাশ ও ভালোবাসার ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
- শিশুদের চুম্বন ও আলিঙ্গন: রাসুল ﷺ তাঁর দৌহিত্র হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে প্রায়ই চুমু খেতেন এবং কোলে নিয়ে আদর করতেন। এক বেদুইন তা দেখে অবাক হয়ে বললে নবীজি ﷺ
বলেন, “আল্লাহ যদি তোমার অন্তর থেকে দয়া কেড়ে নেন, তবে আমার কী করার আছে?” (সহিহ বুখারি)। - নামাজের মধ্যে শিশুদের যত্ন: রাসুল ﷺ নামাজে সিজদারত অবস্থায় তাঁর পিঠে হাসান বা হুসাইন (রা.) চড়ে বসলে তিনি তাদের নামা পর্যন্ত সিজদা দীর্ঘ করতেন।
- শিশুদের সালাম দেওয়া: আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল ﷺ শিশুদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তাদেরও আগে সালাম দিতেন এবং তাদের সাথে কুশল বিনিময় করতেন।
- শিশুদের সান্ত্বনা দেওয়া: এক শিশুর পোষা পাখি মারা গেলে রাসুল ﷺ নিজে গিয়ে সেই শিশুকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন।
শিশুর মানসিক অনুভূতিকে যথাযথ সম্মান দেওয়া এবং তাদের ভীতিমুক্ত ভালোবাসাময় পরিবেশে গড়ে তোলার শিক্ষা রাসুল ﷺ–এর জীবনে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান।
৭. পরিবার ও সন্তান প্রতিপালনে রাসুল ﷺ–এর আদর্শ
একটি আদর্শ ও শান্তিময় পরিবার গঠনের জন্য রাসুল ﷺ–এর পারিবারিক জীবনই সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত। পরিবারে তিনি ছিলেন একজন স্নেহশীল স্বামী এবং যত্নবান পিতা।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম; আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের চেয়ে অধিক উত্তম।” (জামে আত–তিরমিজি)
- পারিবারিক কাজে সহায়তা: হযরত আয়েশা (রা.) উল্লেখ করেছেন, নবীজি ﷺ
ঘরে থাকাকালীন পরিবারের কাজে সাহায্য করতেন,
নিজের জুতো মেরামত করতেন এবং কাপড়ে তালি লাগাতেন। - কন্যা সন্তানের প্রতি সম্মান: জাহেলি যুগে যখন কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো,
তখন রাসুল ﷺ কন্যাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন। কন্যা ফাতেমা (রা.) ঘরে প্রবেশ করলে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান জানাতেন এবং নিজের বসার স্থানে বসাতেন।
সন্তানকে কেবল খাবার বা পোশাক দেওয়া নয়, বরং উত্তম শিষ্টাচার ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়াই যে পিতামাতার মূল দায়িত্ব, তা রাসুল ﷺ বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
৮. প্রতিবেশী ও অসহায় মানুষের প্রতি রাসুল ﷺ–এর আচরণ
প্রতিবেশীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামের ভূমিকা অনন্য। রাসুল ﷺ বলেছেন:
“জিবরাইল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে এত বেশি তাগিদ দিচ্ছিলেন যে, আমার মনে হচ্ছিল হয়তো প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি)
প্রতিবেশী মুসলিম হোক বা অমুসলিম, তাদের খোঁজখবর নেওয়া, বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং ক্ষুধার্ত থাকলে খাবার পৌঁছে দেওয়া রাসুল ﷺ–এর নিয়মিত আমল ছিল। তিনি দরিদ্র,
এতিম ও বিধবাদের সহযোগিতাকে জিহাদের সমতুল্য সওয়াবের কাজ বলে ঘোষণা করেছেন।
৯. ধৈর্য ও বিপদের সময় রাসুল ﷺ–এর অবিচলতা
মহানবী ﷺ–এর জীবনে একের পর এক কঠিন পরীক্ষা এসেছিল। শৈশবে পিতা–মাতাকে হারানো,
নবুয়তের পর সমাজ কর্তৃক বয়কট, প্রিয় সহধর্মিণী খাদিজা (রা.) ও চাচা আবু তালিবের ইন্তেকাল এবং নিজ সন্তানদের একে একে মৃত্যু—সবকিছু তিনি অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন।
সন্তান ইব্রাহিমের মৃত্যুর পর রাসুল ﷺ–এর চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল। তিনি বলেছিলেন:
“চোখ অশ্রু ঝরায়, হৃদয় ব্যথিত হয়; তবে আমরা মুখে এমন কিছুই বলব না যা আমাদের রবের অসন্তুষ্টির কারণ হয়।” (সহিহ বুখারি)
বিপদে ধৈর্য ধারণ (সবর) এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা (তাওয়াক্কুল) রাখার এই শিক্ষা প্রতিটি মুমিনের জীবনের মূল চালিকাশক্তি।
১০. ন্যায়বিচার ও মানবিকতার ক্ষেত্রে তাঁর অনুপম শিক্ষা
ইসলামে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি বা পক্ষপাতিত্বের স্থান নেই। রাসুল ﷺ ন্যায়বিচারের এমন মানদণ্ড স্থাপন করেছিলেন,
যা ইতিহাসে বিরল।
কুরাইশ বংশের এক সম্ভ্রান্ত নারী চুরির অপরাধে ধরা পড়ার পর যখন তাঁর শাস্তি মওকুফের সুপারিশ করা হলো, তখন রাসুল ﷺ অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে ঐতিহাসিক সেই কথাটি উচ্চারণ করেন:
“আল্লাহর কসম! মুহাম্মদ ﷺ–এর মেয়ে ফাতেমাও যদি চুরি করত,
তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম।” (সহিহ বুখারি)
তিনি যুদ্ধক্ষেত্রেও নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও গাছপালা ধ্বংস না করার কঠোর নির্দেশ দিতেন। অমুসলিমদের সাথে কৃত চুক্তি রক্ষা এবং তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করার ক্ষেত্রেও তাঁর নির্দেশনা ছিল অত্যন্ত সুস্পষ্ট।
১১. বর্তমান সময়ে সন্তানদের রাসুল ﷺ–এর আদর্শে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা
ডিজিটাল যুগ ও সোশ্যাল মিডিয়ার তীব্র প্রভাবে আজকের শিশুরা নানাবিধ অনৈতিক বিভ্রান্তির মুখোমুখি হচ্ছে। আধুনিকতার মোহে অনেক সময় তারা আধ্যাত্মিক ও মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে হলে শিশুদের জন্য রাসুলের আদর্শ বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।
|
বর্তমান সংকট |
রাসুল ﷺ–এর শিক্ষা ভিত্তিক সমাধান |
|
একাকীত্ব ও হতাশা |
আল্লাহর প্রতি ভরসা ও পরিবারের সাথে আন্তরিক যোগাযোগ |
|
মিথ্যা ও প্রতারণার প্রবণতা |
সত্যবাদিতা ও সততার সুন্নাহ শিক্ষা দেওয়া |
|
বড়দের প্রতি অশ্রদ্ধা |
বিনয়, |
|
হিংসা ও স্বার্থপরতা |
পরোপকার, |
সন্তানদের যদি ছোটবেলা থেকেই রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর ত্যাগ,
সততা ও চরিত্রের সাথে পরিচয় করিয়ে না দেওয়া হয়,
তবে তারা পার্থিব শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও প্রকৃত অর্থে আদর্শ মানুষ হতে পারবে না।
১২. অভিভাবকরা কীভাবে সন্তানদের মধ্যে নবীজি ﷺ–এর ভালোবাসা তৈরি করবেন
মুখে শুধু ভালোবাসার দাবি না করে বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে সন্তানদের হৃদয়ে নবীজি ﷺ–এর ভালোবাসা গেঁথে দিতে হবে। অভিভাবকরা নিচের পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করতে পারেন:
- নবীজি ﷺ–এর সিরাত শোনানো: ছোটবেলা থেকেই শিশুদের রূপকথার কাল্পনিক গল্পের পরিবর্তে রাসুল ﷺ–এর সাহসিকতা,
দয়ালু স্বভাব ও শৈশবের সত্য ঘটনাগুলো গল্পচ্ছলে শোনান। - ব্যবহারিক সুন্নাহর অনুশীলন: ডান হাতে খাবার খাওয়া, খাবার শেষে দোয়া পড়া,
সালাম দেওয়া, হাসিমুখে কথা বলার মতো সহজ সুন্নাহগুলো পরিবারের সবাই মিলে চর্চা করুন। - উপহার ও ইতিবাচক মনোভাব: সন্তান কোনো ভালো কাজ বা সুন্নাহ পালন করলে তাকে উৎসাহিত করুন এবং উপহার দিন।
- নিজেদের রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন: অভিভাবকরা নিজেরা সত্যবাদী,
ধৈর্যশীল ও ক্ষমাশীল হলে সন্তানরাও তা স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের জীবনে গ্রহণ করবে।
১৩. দৈনন্দিন জীবনে রাসুল ﷺ–এর সুন্নাহ বাস্তবায়নের সহজ উপায়
নবীজি ﷺ–এর আদর্শ অনুসরণ করতে হলে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের ছোট ছোট কাজগুলো সুন্নাহ অনুযায়ী করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
- কথা বলার ক্ষেত্রে: সর্বদা সত্য কথা বলা, গিবত ও পরনিন্দা থেকে জবানকে হেফাজত করা এবং অনর্থক বিতর্ক এড়িয়ে চলা।
- লেনদেন ও কর্মক্ষেত্রে: পূর্ণ সততা ও আমানতদারি রক্ষা করা এবং ওজনে বা হিসেবে কোনো প্রকার কারচুপি না করা।
- প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কে: তাদের কোনো ধরনের কষ্ট না দেওয়া এবং কোনো ভালো খাবার রান্না হলে তাদের সাথে শেয়ার করা।
- রাগ নিয়ন্ত্রণে: রাগ দমন করা, ক্ষমা করার মানসিকতা রাখা এবং অপরকে হাসিমুখে অভিবাদন জানানো।
- আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমল: প্রতিদিনের ফরজ ইবাদতগুলো যত্নের সাথে আদায় করা এবং সাধ্যমতো নফল ইবাদত ও দান–সদকায় অংশ নেওয়া।
উপসংহার: রাসুল ﷺ–এর জীবন অনুসরণের হৃদয়স্পর্শী আহ্বান
আমাদের জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাস অত্যন্ত মূল্যবান। এই সংক্ষিপ্ত জীবনে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং জান্নাতের চিরস্থায়ী সুখ লাভের একমাত্র রাজপথ হলো প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ–এর দেখানো পথ। তাঁর সুমহান চরিত্র,
মানবপ্রেম ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে আমরা আমাদের ব্যক্তিজীবনকে করতে পারি অর্থপূর্ণ, পরিবারকে করতে পারি শান্তিময় এবং সমাজকে করতে পারি বৈষম্যহীন। আসুন, আমরা কেবল মৌখিক ভালোবাসার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আমাদের প্রতিটি আচরণ, চিন্তা ও পদক্ষেপে রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর জীবনাদর্শকে পুনরুজ্জীবিত করি।
আসুন আজই একটি দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করি:
প্রিয় নবীজি ﷺ–এর সিরাত গভীরভাবে অধ্যয়ন করুন,
তাঁর সুন্নাহকে নিজের জীবনে ধারণ করুন এবং আপনার সন্তানদের রাসুল ﷺ–এর অনুপম আদর্শে গড়ে তুলুন। আজ থেকেই পরিবারে প্রতিদিন অন্তত একটি সুন্নাহ চর্চা শুরু করুন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর খাঁটি অনুসারী হিসেবে কবুল করুন। আমিন।

