লেখক: শিশুশিক্ষা ও প্যারেন্টিং গবেষক মুফতি আব্দুল্লাহ আল হাদী [এম.এ, ঢাবি] |
পরিচালক: তাকওয়া শিশু একাডেমি ও মাদরাসাতুল ঈমান, ঢাকা।
![]() |
| abdullah al hadi |
ভোরের আলো ফোটার আগেই শহরের অলিগলি মুখরিত হতে শুরু করে।
কেউ ছুটছেন প্রথম লোকাল বাসটি ধরার জন্য, কেউ প্রস্তুত হচ্ছেন দীর্ঘ ট্রাফিক ঠেলে
কর্পোরেট অফিসে যাওয়ার জন্য। তরুণ শিক্ষার্থী ল্যাপটপের সামনে বসে ঘণ্টার পর
ঘণ্টা ফ্রিল্যান্সিং দক্ষতা ঝালিয়ে নিচ্ছেন, আর ব্যবসায়ী
ভাবছেন কীভাবে পরবর্তী প্রান্তিকে বিক্রির অংকটা দ্বিগুণ করা যায়। জীবনের প্রতিটি
পদক্ষেপে আমাদের এই অবিরাম ছুটে চলা—ভালো একটি চাকরি, একটু
বেশি বেতন, নিরাপদ ভবিষ্যৎ, সন্তানকে
একটি ভালো স্কুলে ভর্তি করা এবং মাস শেষে পরিবারের সব প্রয়োজন মিটিয়ে কিছু
সঞ্চয় করা।
এই চেষ্টা কোনোভাবেই অন্যায় নয়। বেঁচে থাকার তাগিদে এবং
পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতে পরিশ্রম করা মানুষের স্বভাবজাত ও সম্মানিত দায়িত্ব।
কিন্তু এই নিরন্তর প্রতিযোগিতার মধ্যে আমরা কি কখনো একটু থেমে নিজের মনকে প্রশ্ন
করেছি?
“আমরা জীবিকা অর্জনের জন্য দিনরাত এতটা মেহনত
করছি, অথচ যে মহান সত্তা রিযিকের প্রকৃত মালিক—তাঁর সঙ্গে
আমাদের সম্পর্ক কতটা গভীর?”
বাস্তবতা হলো, অনেকেই পার্থিব চেষ্টা-তদবিরের পেছনে ছুটতে
গিয়ে জীবিকার মূল উৎসকেই ভুলে বসেন। আবার অনেকে ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে মনে করেন,
আধ্যাত্মিক আমল করলেই কোনো পরিশ্রম ছাড়া ঘরে খাবার পৌঁছে যাবে।
ইসলাম এই দুটি চরমপন্থার কোনোটিকেই সমর্থন করে না। ইসলাম আমাদের শেখায়—হাত দিয়ে
সর্বোচ্চ পরিশ্রম করতে হবে, আর হৃদয়ের সম্পূর্ণ ভরসা রাখতে
হবে বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর ওপর।
১. রিযিক কী এবং রিযিকের প্রকৃত মালিক কে?
সাধারণ সমাজে ‘রিযিক’ শব্দটিকে অত্যন্ত সংকীর্ণ অর্থে
ব্যবহার করা হয়। অনেকেই মনে করেন, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কত টাকা জমা হলো,
মাস শেষে কত টাকা বেতন এলো বা কত বিঘা জমির মালিকানা অর্জন করা
গেল—শুধু এগুলোই রিযিক। কিন্তু ইসলামী আকিদা ও দর্শনে রিযিকের পরিধি অত্যন্ত
ব্যাপক ও গভীর।
বান্দার জীবনধারণ, বিকাশ ও কল্যাণের জন্য যা কিছু প্রয়োজন
এবং যা সে ভোগ করে—তার সবই রিযিকের অন্তর্ভুক্ত:
- শারীরিক
সুস্থতা: কোটি টাকা থাকলেও যদি বিছানায় শুয়ে কৃত্রিম
অক্সিজেনের ওপর নির্ভর করতে হয়, তবে সেই টাকা আসল রিযিক নয়; বরং সুস্থ একটি ফুসফুস ও ব্যথাহীন শরীরই মহান রিযিক। - মানসিক
প্রশান্তি: দুশ্চিন্তাহীন ঘুম, উদ্বেগমুক্ত
অন্তর এবং অল্পতে তুষ্ট থাকার ক্ষমতা (কানাআত)। - নেককার
সন্তান ও পরিবার: ঘরে ফিরে এমন একটি পরিবার পাওয়া, যা চোখের শীতলতা এনে দেয়। - সময়
ও প্রজ্ঞা: সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জ্ঞান এবং সময়ের
সদ্ব্যবহার করার তাওফিক। - ঈমান
ও নেক আমল: আল্লাহর সন্তুষ্টিমূলক কাজে সময় ব্যয় করার সুযোগ
পাওয়া সর্বশ্রেষ্ঠ আত্মিক রিযিক।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা
করেছেন যে, সৃষ্টির প্রতিটি অণু-পরমাণুর রিযিকের দায়িত্ব একমাত্র তাঁর
হাতে।
وَمَا مِن دَآبَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا
“ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী
নেই, যার রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর বর্তায় না।”
— সূরা হুদ, আয়াত: ৬
আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন:
إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ
“নিশ্চয় আল্লাহই রিযিকদাতা, মহাশক্তিধর, পরাক্রমশালী।”
— সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৮
চাকরিদাতার প্রতিষ্ঠান, ব্যবসার গ্রাহক
কিংবা দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা—এগুলো কেবল রিযিক পৌঁছানোর মাধ্যম বা ‘সবব’। এগুলো
রিযিকের আসল উৎস নয়। উৎস হলেন একমাত্র ‘আর-রাযযাক’ আল্লাহ।
২. রিযিকের জন্য দুনিয়াবি প্রচেষ্টা: ইসলাম কি
নিষ্ক্রিয়তা শেখায়?
একটি প্রচলিত বিভ্রান্তি হলো—যেহেতু আল্লাহ রিযিকের
জিম্মাদার, তাই মানুষের কষ্ট করে কাজ করার কী প্রয়োজন? এই ধারণা কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
ইসলামে শ্রম ও মেহনত কেবল প্রশংসনীয়ই নয়, বরং তা অন্যতম সেরা সৎকাজ। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
“নিজ হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাদ্য
কেউ কখনো খায়নি। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতের উপার্জনে জীবিকা নির্বাহ
করতেন।”
— সহিহ বুখারি: ২০৭২
তাদবির (পার্থিব প্রচেষ্টা) এবং তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর
ভরসা)-এর ভারসাম্যই হলো ইসলামের পথ। মুমিন ব্যক্তি তার মেধা, সময় ও সর্বোচ্চ শারীরিক শ্রম দিয়ে হালাল কাজের চেষ্টা করবে, দক্ষতা অর্জন করবে এবং বাজারের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে
নিবে। কিন্তু ফলাফলের জন্য নিজের মেধার ওপর অহংকার করবে না; বরং
ফলাফল আল্লাহর ওপর সোপর্দ করবে। উপায় গ্রহণ করা মানুষের শারীরিক ইবাদত, আর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা হৃদয়ের ইবাদত।
৩. তাকওয়া ও আল্লাহভীতি: অচিন্তনীয় রিযিকের চাবিকাঠি
তাকওয়া অর্থ আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসার সমন্বয়ে তাঁর
নির্দেশ মেনে চলা এবং নিষেধ থেকে নিজেকে রক্ষা করা। কর্মক্ষেত্র ও ব্যবসায় যখন
একজন ব্যক্তি সততা বজায় রাখে এবং ক্ষণস্থায়ী লাভের লোভে অন্যায় পথ পরিহার করে, তখনই সে তাকওয়ার পরিচয় দেয়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
“আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে,
তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে
রিযিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।”
— সূরা আত-তালাক, আয়াত: ২–৩
বাস্তব জীবনের উদাহরণ:
একটি কোম্পানির সেলস এক্সিকিউটিভ চাইলেই ভুয়া ভাউচার বা
অনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে প্রতি মাসে অতিরিক্ত লাখ টাকা হাতিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু
আল্লাহর ভয়ে তিনি সেই সুযোগ ফিরিয়ে দিলেন এবং নিজের নির্ধারিত সীমিত আয়েই
সন্তুষ্ট থাকলেন। ظاهري (বাহ্যিক)
দৃষ্টিতে হয়তো মনে হবে তিনি পিছিয়ে পড়লেন, কিন্তু তাকওয়ার ফলাফল হলো—আল্লাহ তাঁর সেই
সীমিত আয়ে এমন বরকত দেবেন যে পরিবারের দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা খরচ কমে যাবে,
পারিবারিক অশান্তি দূর হবে এবং এমন কোনো অভাবনীয় পদোন্নতি বা সুযোগ
আসবে যা তিনি কখনো হিসাব করে বের করতে পারতেন না।
৪. তওবা ও আন্তরিক ইস্তিগফার: আসমানি রহমতের দ্বার
পাপ মানুষের জীবন থেকে বরকত কেড়ে নেয় এবং রিযিকের পথ
সংকুচিত করে। অন্যদিকে আন্তরিক তওবা ও নিয়মিত ইস্তিগফার আসমানের রহমতের দরজা খুলে
দেয়।
হজরত নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে যে নসিহত করেছিলেন, তা পবিত্র কুরআনে সংরক্ষিত রয়েছে:
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَارًا
“অতঃপর আমি বলেছি, তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়
তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টিপাত পাঠাবেন,
তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সমৃদ্ধি দান করবেন এবং তোমাদের
জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদ-নদী।”
— সূরা নূহ, আয়াত: ১০–১২
ইস্তিগফার শুধু জবান দিয়ে দ্রুত ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ আওড়ানো
নয়; বরং এর সারমর্ম হলো কৃত পাপের জন্য অন্তরে অনুশোচনা প্রকাশ
করা, অন্যায় কাজ থেকে অবিলম্বে ফিরে আসা এবং ভবিষ্যতে তা না
করার দৃঢ় সংকল্প করা।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার আঁকড়ে
ধরে, আল্লাহ তার প্রতিটি সংকটের জন্য উত্তরণের পথ বের করে
দেন, সব দুশ্চিন্তা থেকে তাকে মুক্তি দেন এবং তাকে এমন স্থান
থেকে রিযিক দান করেন যা সে ধারণাও করতে পারে না।”
— সুনানে আবু দাউদ: ১৫১৮, মুসনাদে আহমাদ:
২২৩৪
৫. শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা: প্রাপ্ত নিয়ামতের সংরক্ষণ ও
প্রবৃদ্ধি
কৃতজ্ঞতা কেবল একটি সুন্দর অনুভূতি নয়, এটি রিযিক বৃদ্ধির সক্রিয় ঐশী নিয়ম। মানুষ যখন প্রাপ্ত নিয়ামতগুলোর
মূল্য বোঝে এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে, তখন আল্লাহ তার
জীবনে প্রাচুর্য দান করেন।
কুরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে:
لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ ۖ وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
“যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো,
তবে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব; আর
যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয় আমার শাস্তি অত্যন্ত
কঠোর।”
— সূরা ইবরাহিম, আয়াত: ৭
শুকরিয়া আদায়ের তিনটি স্তর রয়েছে:
(১) অন্তরের
শুকরিয়া: অন্তরে বিশ্বাস করা যে প্রতিটি নিয়ামত একমাত্র
আল্লাহর অনুগ্রহে অর্জিত হয়েছে।
(২) মুখের
শুকরিয়া: কথায় কথায় অভিযোগ না করে আলহামদুলিল্লাহ বলা এবং
আল্লাহর প্রশংসা করা।
(৩) অঙ্গপ্রত্যঙ্গের
শুকরিয়া: প্রাপ্ত ধন-সম্পদ, স্বাস্থ্য ও
মেধাকে পাপ কাজে ব্যবহার না করে আল্লাহর বিধান মোতাবেক খরচ করা।
অতিরিক্ত ভোগের লিপ্সা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের ঝলমলে
জীবন দেখে নিজের প্রাপ্তিকে তুচ্ছ ভাবা মানুষের মাঝে মানসিক দারিদ্র্য তৈরি করে।
যে ব্যক্তি নিজের স্বল্প আয়ে শুকরিয়া আদায় করতে পারে, সে কোটিপতির চেয়েও বেশি মানসিক স্বস্তিতে বসবাস করে।
৬. দান-সদকা ও আল্লাহর পথে ব্যয়: পবিত্র বৃদ্ধির বিধান
বাহ্যিক গণিতের দৃষ্টিতে দান করলে পকেটের টাকা কমে যায়।
কিন্তু আসমানি গণিতে সদকা সম্পদকে পরিশোধিত, সুরক্ষিত ও বহুগুণে বরকতময় করে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَمَا أَنفَقْتُم مِّن شَيْءٍ فَهُوَ يُخْلِفُهُ ۖ وَهُوَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ
“তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, তিনি তার প্রতিদান দেবেন। আর তিনিই তো সর্বোত্তম রিযিকদাতা।”
— সূরা সাবা, আয়াত: ৩৯
রাসুলুল্লাহ ﷺ দ্ব্যর্থহীন
ভাষায় ঘোষণা করেছেন:
“সদকা কখনো সম্পদ কমায় না।”
— সহিহ মুসলিম: ২৫৮৮
দান-সদকার বরকত কেবল নতুন টাকা আসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
দান করার কারণে আল্লাহ কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারেন, কঠিন রোগব্যাধি থেকে রক্ষা করতে পারেন, কিংবা মনে
এমন প্রশান্তি দিতে পারেন যা দুনিয়ার সমস্ত সম্পদের চেয়ে মূল্যবান।
৭. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা (সিলাতুর রাহিম)
পারিবারিক বন্ধন রক্ষা করা ও নিকটাত্মীয়দের খোঁজখবর রাখা
ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ইবাদত। হাদিস শরিফে স্পষ্ট এসেছে যে আত্মীয়তার
সম্পর্ক বজায় রাখলে রিযিক প্রশস্ত হয় এবং আয়ু বৃদ্ধি পায়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে তার রিযিক
প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ু দীর্ঘায়িত হোক, সে যেন তার
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।”
— সহিহ বুখারি: ৫৯৮৬, সহিহ মুসলিম: ২৫৫৭
পিতামাতার সেবা করা, ভাই-বোনদের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো এবং
অসচ্ছল আত্মীয়-স্বজনদের গোপনে সহযোগিতা করা রিযিকের বন্ধ দরজা উন্মুক্ত করার
অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
৮. আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল ও সঠিক চেষ্টা
তাওয়াক্কুল শব্দের অর্থ হাত গুটিয়ে ঘরে বসে থাকা নয়।
তাওয়াক্কুলের বাস্তব উদাহরণ পাখিদের জীবনধারার মধ্যে অত্যন্ত সুস্পষ্ট।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
“তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে
তাওয়াক্কুল করতে, তবে তিনি তোমাদের এমনভাবে রিযিক দিতেন
যেমন পাখিদের রিযিক দিয়ে থাকেন—পাখি সকালে খালি পেটে বাসা থেকে বের হয় এবং
সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।”
— জামে তিরমিযি: ২৩৪৪, সুনানে ইবনে মাজাহ:
৪১৬৪
পাখি ঘরে বসে থাকে না; সে ভোরে উড়াল দেয়, আহারের
সন্ধান করে এবং পরিশ্রম শেষে নীড়ে ফিরে। মানুষের দায়িত্বও তেমনি—কঠোর মেহনত করা
এবং ফলাফলের সম্পূর্ণ দায়িত্ব আল্লাহর প্রজ্ঞার ওপর ছেড়ে দেওয়া।
৯. হালাল উপার্জনের অপরিহার্যতা ও হারামের ভয়াবহতা
ইসলামে উপার্জন কেবল একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, এটি অন্যতম প্রধান ইবাদত—যদি তা হালাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়। হারাম পথে
কোটি টাকা উপার্জন করা সম্ভব হলেও তাতে বিন্দুমাত্র বরকত থাকে না; বরং তা জাহান্নামের জ্বালানি তৈরি করে এবং দোয়া কবুলের পথ চিরতরে বন্ধ
করে দেয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ এক ব্যক্তির
কথা উল্লেখ করলেন, যে দীর্ঘ সফর করে ধুলায় ধূসরিত অবস্থায়
আসমানের দিকে হাত তুলে ডাকছে: ‘হে আমার প্রতিপালক! হে
আমার প্রতিপালক!’ অথচ:
“তার খাদ্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম এবং সে হারাম
দ্বারাই পুষ্টি লাভ করেছে—তাহলে কীভাবে তার দোয়া কবুল হতে পারে?”
— সহিহ মুসলিম: ১০১৫
ঘুষ, সুদ, ওজনে কম দেওয়া,
গ্রাহককে মিথ্যা তথ্য দিয়ে পণ্য বিক্রি করা, কর্মক্ষেত্রে
ফাঁকি দেওয়া ইত্যাদি সাময়িকভাবে সম্পদ বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে তা পরিবারে ধ্বংস,
অশান্তি ও আসমানি গজব ডেকে আনে। মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত পরিমাণে
কম হলেও সম্পূর্ণ খাঁটি ও হালাল উপার্জন।
১০. নামাজ ও আল্লাহর সঙ্গে জীবন্ত সংযোগ
নামাজ বান্দাকে আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করে। পরিবারের
সদস্যদের নামাজের নির্দেশ দেওয়া এবং নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার
ব্যাপারে কুরআনে বিশেষ তাগিদ এসেছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا ۖ لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا ۖ نَّحْنُ نَرْزُقُكَ ۗ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَىٰ
“আর আপনার পরিবারবর্গকে নামাজের আদেশ
দিন এবং এর ওপর অবিচল থাকুন। আমি আপনার কাছে কোনো রিযিক চাই না; বরং আমিই আপনাকে রিযিক দিই। আর শুভ পরিণাম তো মুত্তাকিদের জন্যই।”
— সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১৩২
সময়মতো জামাতে নামাজ আদায় করা জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে
শৃঙ্খলা ও বরকত সৃষ্টি করে।
১১. রিযিক ও হালাল জীবিকা অর্জনের সহিহ দোয়াসমূহ
আল্লাহর কাছে রিযিকের জন্য বিনম্রভাবে প্রার্থনা করা
অত্যন্ত পছন্দনীয় আমল। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে
সকাল-সন্ধ্যা এবং বিভিন্ন নামাজের পর এই দোয়াগুলো পাঠ করতেন:
১. হালাল রিযিক ও উপকারী জ্ঞানের দোয়া
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا طَيِّبًا، وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফি‘আ, ওয়া রিযকান ত্বাইয়িবা, ওয়া
আমালান মুতাক্বাব্বালা।
অর্থ: “হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি আপনার নিকট
উপকারী জ্ঞান, পবিত্র-হালাল রিযিক এবং কবুলযোগ্য আমল
প্রার্থনা করছি।”
সূত্র: সুনানে ইবনে মাজাহ: ৯২৫ (সহিহ)
২. হারাম থেকে বেঁচে হালাল দিয়ে তুষ্ট থাকার দোয়া
اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাকফিনী বিহালালিকা ‘আন হারামিক, ওয়া আগনিনী বিফাদ্বলিকা ‘আম্মান সিওয়াক।
অর্থ: “হে আল্লাহ! আমাকে আপনার হালাল দ্বারা
আপনার হারাম থেকে যথেষ্ট করুন এবং আপনার অনুগ্রহের মাধ্যমে আপনি ছাড়া অন্য সবার
থেকে আমাকে অমুখাপেক্ষী করে দিন।”
সূত্র: জামে তিরমিযি: ৩৫৬৩ (হাসান)
৩. ঋণ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির দোয়া
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযান, ওয়া আউযু বিকা মিনাল আজযি ওয়াল কাসাল, ওয়া আউযু
বিকা মিনাল জুবনি ওয়াল বুখল, ওয়া আউযু বিকা মিন গালাবাতিদ
দাইনি ওয়া ক্বাহরির রিজাল।
অর্থ: “হে আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি
দুশ্চিন্তা ও শোক থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, ভীরুতা ও কৃপণতা থেকে এবং ঋণের বোঝা ও মানুষের দমন-পীড়ন থেকে।”
সূত্র: সহিহ বুখারি: ২৮৯৩
১২. পরিমাণ বনাম বরকত: আসল প্রাচুর্য কোনটি?
টাকার অংক বেশি হলেই মানুষ ধনী হয় না; আসল ধন হলো অন্তরের অভাবহীনতা।
|
পার্থিব অংক (শুধু সংখ্যা) |
রিযিকের বরকত (প্রকৃত সম্পদ) |
|
মাসিক আয় লাখ টাকা, কিন্তু চিকিৎসায় বা অপচয়ে সব শেষ |
স্বল্প আয়, কিন্তু পরিবার রোগবালাই ও অপ্রয়োজনীয় |
|
বিলাসবহুল বাড়ি, কিন্তু রাতে দুশ্চিন্তায় ঘুম নেই |
সাধারণ বাসা, কিন্তু গভীর ও প্রশান্তিময় নিদ্রা |
|
বিপুল সম্পদ, কিন্তু সন্তান অবাধ্য ও পরিবারে কলহ |
সীমিত সামর্থ্য, কিন্তু সন্তান নেককার ও পরিবারে |
|
সর্বদা আরও চাই ক্ষুধা ও অতৃপ্তি |
অল্পতেই তৃপ্ত ও আল্লাহর প্রতি সর্বদা কৃতজ্ঞ মন |
রাসুলুল্লাহ ﷺ যথার্থই
বলেছেন:
“সম্পদের প্রাচুর্য প্রকৃত ধনী হওয়া
নয়; বরং অন্তরের প্রাচুর্য ও তৃপ্তিই হলো আসল ধনী
হওয়া।”
— সহিহ বুখারি: ৬৪৪৭, সহিহ মুসলিম: ১০৫১
১৩. অনেক আমল করার পরও কেন রিযিকের সংকট দেখা দেয়?
কখনো কোনো মুমিন সমস্ত আমল করার পরও আর্থিক সংকটে পড়তে
পারেন। এর অর্থ এই নয় যে আল্লাহ তার ওপর অসন্তুষ্ট বা তার আমল ব্যর্থ হয়েছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে:
(১) দুনিয়া
পরীক্ষার ক্ষেত্র: আল্লাহ সম্পদ দিয়েও পরীক্ষা করেন, আবার সম্পদ সংকুচিত করেও বান্দার ধৈর্য পরীক্ষা করেন (সূরা
আল-বাকারা: ১৫৫)।
(২) নবী
ও নেককারদের ইতিহাস: সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ রাসুলুল্লাহ ﷺ এবং তাঁর
সাহাবিদের জীবনে বহুবার কঠিন ক্ষুধা ও অনাহারের দিন গেছে।
(৩) আখিরাতের
মর্যাদা বৃদ্ধি: কষ্টের মুহূর্তে সবর করলে আল্লাহ বান্দার গুনাহ মোচন
করেন এবং জান্নাতে তার মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেন।
(৪) আল্লাহর
প্রজ্ঞাময় ফায়সালা: কখনো আল্লাহ জানেন যে নির্দিষ্ট কোনো বান্দাকে প্রচুর
সম্পদ দিলে সে অহংকারী হয়ে পথভ্রষ্ট হবে, তাই
ভালোবাসার কারণেই তাকে নির্দিষ্ট মাপে রিযিক দেন (সূরা আশ-শুরা: ২৭)।
১৪. রিযিকে বরকত লাভের জন্য একটি আদর্শ দৈনিক রুটিন
রিযিকের বরকত অর্জন কোনো অলৌকিক জাদু নয়; এটি প্রতিদিনের সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের ফল।
- ভোর
ও সকাল: ফজরের নামাজ সময়মতো আদায় করা। ভোরের বরকতময় সময়ে
কাজ শুরু করা এবং সকালের মাসনুন দোয়া পাঠ করা। - কর্মক্ষেত্র
ও ব্যবসা: কাজে সততা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, সময়ের মূল্য দেওয়া ও গ্রাহকের সাথে ন্যায়সংগত আচরণ করা। কোনো
অবস্থাতেই সুদ, ঘুষ বা মিথ্যার আশ্রয় না নেওয়া। - দিনের
অন্যান্য সময়: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায় করা, অবসর সময়ে নিয়মিত ইস্তিগফার (আস্তাগফিরুল্লাহ) পাঠ করা। - দান
ও আত্মীয়তা: সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে সামান্য
হলেও গোপনে দান করা এবং নিকটাত্মীয়দের খোঁজ নেওয়া। - রাতের
প্রস্তুতি: এশার পর দ্রুত ঘুমানোর চেষ্টা করা, সারাদিনের প্রাপ্তির জন্য আল্লাহর শুকরিয়া জানানো এবং আগামীর সব
পরিকল্পনা আল্লাহর ওপর সোপর্দ (তাওয়াক্কুল) করা।
উপসংহার ও আত্মপর্যালোচনা
জীবিকার সন্ধানে আমরা আমাদের মেধা, শ্রম ও প্রযুক্তিকে সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগাবো। কিন্তু হৃদয়ের গভীরে
সর্বদা এই বিশ্বাস প্রোথিত রাখতে হবে—উপায় কেবল একটি মাধ্যম, উপায়ের স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক একমাত্র মহান আল্লাহ।
আজকের এই মুহূর্তে আমাদের নিজেদের একটু প্রশ্ন করা
প্রয়োজন:
- আমার
উপার্জনের প্রতিটি পয়সা কি সম্পূর্ণ হালাল? - কাজের
ব্যস্ততায় আমি কি রিযিকদাতা আল্লাহর ফরজ বিধানগুলো ভুলে যাচ্ছি? - আমার
জিহ্বায় কি প্রতিনিয়ত তওবা ও ইস্তিগফার রয়েছে? - অভাবের
দিনে অভিযোগ না করে এবং প্রাচুর্যের দিনে অহংকার না করে আমি কি শুকরিয়া
আদায় করছি? - আমি
কি মানুষের দরজায় যতটা ধরনা দিচ্ছি, তার সিকিভাগও
কি তাহাজ্জুদের জায়নামাজে দু‘হাত তুলে রিযিকের মালিকের
কাছে চাইছি?
আসুন, পার্থিব সব প্রচেষ্টা চালিয়ে যাই পূর্ণ
সততার সাথে, আর অন্তরের সমস্ত আস্থা অর্পণ করি সেই মহান
সত্তার চরণে—যিনি সাগরের অতল গহ্বরে ক্ষুদ্র কীটকেও ভুলে যান না।
মেটা বিবরণ ও এসইও ডেটা (SEO Meta Data)
- Meta
Description: রিযিকের বরকত ও প্রাচুর্য লাভের
কুরআন-হাদিসভিত্তিক উপায়সমূহ জানুন। তাকওয়া, ইস্তিগফার,
শুকরিয়া, দান-সদকা ও হালাল উপার্জনের
মাধ্যমে কীভাবে জীবনে বরকত আসবে তার বিস্তারিত গাইড। - SEO
Keywords: রিযিক বৃদ্ধি, রিযিকের
বরকত, রিযিক বৃদ্ধির আমল, রিযিকের
জন্য আমল, হালাল রিযিক, রিযিকের
মালিক আল্লাহ, রিযিক বৃদ্ধির দোয়া, বরকত লাভের উপায়। - বাংলা
ট্যাগসমূহ: রিযিকের_আমল, হালাল_উপার্জন, তাওয়াক্কুল, ইসলামিক_জীবনব্যবস্থা, দোয়ায়ে_রিযিক,
বরকত, আত্মশুদ্ধি, কুরআন_ও_হাদিস।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. শুধু আমল করলেই কি রিযিক বৃদ্ধি পাবে, কাজ করার প্রয়োজন নেই?
না। ইসলামে চেষ্টা ও আমল পরস্পরের পরিপূরক। হাত দিয়ে
সর্বোচ্চ পরিশ্রম ও দক্ষতা প্রয়োগ করতে হবে এবং অন্তরে ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর
তাওয়াক্কুল ও আমল করতে হবে।
২. রিযিক বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী আমল কোনটি?
কুরআন ও হাদিসের আলোকে নিয়মিত ও আন্তরিক ইস্তিগফার (ক্ষমা
প্রার্থনা), তাকওয়া অবলম্বন, আত্মীয়তার সম্পর্ক
বজায় রাখা এবং সকাল-সন্ধ্যা হালাল রিযিকের জন্য দোয়া করা সবচেয়ে শক্তিশালী আমল।
৩. হারাম উপার্জনে কি সাময়িক বরকত পাওয়া সম্ভব?
হারাম উপার্জনে বাহ্যিকভাবে টাকার অংক বাড়তে পারে, কিন্তু তাতে বরকত থাকে না। হারাম সম্পদ পরিবারে অশান্তি, রোগবালাই, অবাধ্য সন্তান ও আখিরাতের কঠিন শাস্তি
ডেকে আনে।
৪. দান করলে কীভাবে সম্পদ বৃদ্ধি পায়?
দান করলে আল্লাহ সম্পদে বরকত দান করেন, বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন, অপচয় ও অযাচিত ক্ষতি
থেকে বাঁচিয়ে দেন এবং আখিরাতে বহুগুণ প্রতিদান দেন।
৫. আর্থিক সংকটে থাকা কি আল্লাহর অসন্তুষ্টির লক্ষণ?
সবসময় নয়। দুনিয়া পরীক্ষার স্থান। নবী-রাসুল ও বহু
নেককার বান্দা দারিদ্র্যের কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছেন। ঈমানের ওপর অটল থেকে
ধৈর্য ধারণ করলে এটি মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হয়।

