লেখক: শিশুশিক্ষা ও প্যারেন্টিং গবেষক মুফতি আব্দুল্লাহ আল হাদী [এম.এ, ঢাবি] |
পরিচালক: তাকওয়া শিশু একাডেমি ও মাদরাসাতুল ঈমান, ঢাকা।
![]() |
| mufti abdullah al hadi |
শ্রেণিকক্ষের শেষ বেঞ্চে বসে থাকা দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর খাতাটি সামনে খোলা। লাল কালির দাগে স্পষ্ট—পড়াশোনায় তার মনোযোগ ক্রমেই তলানিতে নামছে। শিক্ষক যখন অভিভাবককে ডেকে নরম সুরে বললেন, “আপনার সন্তান সাম্প্রতিক সময়ে ক্লাসে মনোযোগ দিচ্ছে না,
বাড়ির কাজ জমা দিচ্ছে না এবং বন্ধুদের সাথে অপ্রয়োজনীয় তর্কে জড়াচ্ছে।” ঠিক তখনই অভিভাবক শিক্ষকের কথা শেষ না হতেই ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে উঠলেন,
“আমার সন্তান এমন করতেই পারে না! বাসায় তো ও সব সময় বই নিয়েই বসে থাকে। আপনার পড়ানোর পদ্ধতিতে কোনো গলদ নেই তো?”
এই চিত্রটি আজ আমাদের শিক্ষাঙ্গনে অত্যন্ত পরিচিত। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে শিক্ষার্থী নিজের অলসতা বা দুষ্টামির কারণে পিছিয়ে পড়ছে। কিন্তু গভীরে তাকালে দেখা যায়, সমস্যাটি শুধু শিক্ষার্থীর আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বড়দের মাত্রাতিরিক্ত পক্ষপাতিত্ব, অতিরিক্ত অন্ধ ভালোবাসা এবং শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি অযৌক্তিক অবিশ্বাসের এক অদৃশ্য জালে সে প্রতিদিন আটকে যাচ্ছে।
ইলম বা প্রকৃত জ্ঞান কেবল মুখস্থবিদ্যার নাম নয়; এটি অর্জনের প্রধান শর্ত হলো বিনম্রতা, শৃঙ্খলা ও শ্রদ্ধাবোধ। একজন শিক্ষার্থী নিজের ব্যক্তিগত ত্রুটির কারণে যতটুকু না শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি বঞ্চিত হয় তার চারপাশের বড়দের ভুল দৃষ্টিভঙ্গির কারণে।
শিক্ষাগ্রহণ একটি ধারাবাহিক মানসিক ও আত্মিক প্রক্রিয়া। একজন শিক্ষার্থী যখন পড়ালেখা থেকে দূরে সরে যায়, তার পেছনে সাধারণত দুটি প্রধান দিক কাজ করে:
- শিক্ষার্থীর নিজস্ব দুর্বলতা: বয়সজনিত চঞ্চলতা, পাঠে অনাগ্রহ,
অলসতা, মোবাইল বা প্রযুক্তির অতিরিক্ত আসক্তি এবং শৃঙ্খলার অভাব। - পরিবেশ ও বড়দের ভূমিকা: পারিবারিক অস্থিরতা, মা–বাবার অতি–সুরক্ষামূলক মনোভাব এবং শিক্ষক–অভিভাবকের মধ্যকার পারস্পরিক আস্থার সংকট।
একটি শিশু যখন বুঝতে পারে যে তার যেকোনো ব্যর্থতা বা অবাধ্যতার জন্য তার পরিবার কোনো না কোনো অজুহাত খুঁজে দেবে, তখন তার ভেতর থেকে শেখার তাগিদ ও জবাবদিহিতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়। শিক্ষার ভিত্তি শুধু ভালো বই কিংবা আধুনিক ক্লাসরুম নয়; এর মূল ভিত্তি হলো শিক্ষার্থীর দায়িত্ববোধ ও শেখার অনুকূল পরিবেশ।
অতিরিক্ত আদর কি সন্তানের ক্ষতি করতে পারে?
স্নেহ ও ভালোবাসা শিশুর মানসিক বিকাশের অন্যতম প্রধান খোরাক। কিন্তু স্নেহ যখন ‘অতিরিক্ত প্রশ্রয়ে’ রূপ নেয়, তখনই বিপত্তির সূচনা হয়। ভালোবাসার কাজ সন্তানকে আত্মবিশ্বাসী ও নীতিবান করা, আর অতিরিক্ত প্রশ্রয় সন্তানকে দায়হীন ও অহংকারী করে তোলে।
সন্তান ভুল করলে তাকে না শুধরে উল্টো সমর্থন দেওয়া, তার হোমওয়ার্ক না করার পেছনে শিক্ষকের কাজের চাপকে দোষারোপ করা কিংবা নিয়মভঙ্গের পর তার পক্ষে সাফাই গাওয়া সুস্থ প্যারেন্টিং নয়। এর ফলে শিশুটি শেখে যে, ভুল করা কোনো সমস্যা নয় এবং ভুলের পরিণতি নিজেকে ভোগ করতে হয় না। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং’ বা ‘অতি–সুরক্ষামূলক আচরণ’, যা শিশুকে বাস্তব জীবনের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পুরোপুরি অক্ষম ও আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে।
‘আমার সন্তান ভুল করতে পারে না’—এই মানসিকতার ক্ষতি
অনেক অভিভাবক অবচেতনভাবেই বিশ্বাস করেন যে তাদের সন্তান নিখুঁত। সন্তান কোনো সহপাঠীকে আঘাত করলে, পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করলে বা শিক্ষকের সাথে দুর্ব্যবহার করলে তারা প্রথমেই অস্বীকার করেন।
এই মানসিকতার মারাত্মক কুফলগুলো হলো:
- আত্মশুদ্ধির সুযোগ নষ্ট: সন্তান যখন বুঝতে পারে মা–বাবা সবসময় তার পক্ষেই থাকবেন, তখন সে নিজের ভুল চিহ্নিত করার এবং অনুতপ্ত হওয়ার সুযোগ হারায়।
- সমালোচনা গ্রহণে অক্ষমতা: ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে বা সামাজিক জীবনে সামান্য সমালোচনা শুনলেই এমন সন্তানরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে বা উগ্র আচরণ করে।
- ভিকটিম মানসিকতা তৈরি: সে সবসময় নিজেকে নির্দোষ এবং পরিস্থিতি বা অন্য ব্যক্তিদের দোষী ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
শিক্ষকের শাসন বনাম অপমান: সূক্ষ্ম পার্থক্যের গুরুত্ব
বর্তমান সময়ে ‘শাসন’ শব্দটিকে প্রায়শই ভুল বোঝাবুঝি ও বিতর্কের মুখে পড়তে হয়। এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বোঝা দরকার—শারীরিক নির্যাতন, কটূক্তি বা মানসিক অবমূল্যায়ন কখনোই শিক্ষার অংশ হতে পারে না। কোনো দায়িত্বশীল শিক্ষক তা সমর্থন করেন না এবং করা উচিতও নয়।
তবে শাসন ও অপমানের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে:
একজন শিক্ষক যখন ক্লাসে নিয়ম ভঙ্গের কারণে শিক্ষার্থীকে দাঁড় করিয়ে রাখেন, অতিরিক্ত অ্যাসাইনমেন্ট দেন বা কঠোর ভাষায় সতর্ক করেন, সেটি অপমান নয়—বরং শৃঙ্খলা শেখানোর অংশ। অভিভাবক যদি শিক্ষকের এই ইতিবাচক শাসনকে ‘অপমান’ হিসেবে চিহ্নিত করে সন্তানের সামনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন, তবে সন্তান কখনো শৃঙ্খলা মেনে চলতে শিখবে না।
শিক্ষকের প্রতি অযৌক্তিক অবিশ্বাসের প্রভাব
জ্ঞান অর্জনের অন্যতম মূলভিত্তি হলো শিক্ষকের প্রতি শিষ্যের আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ। ইসলামি নীতিশাস্ত্রে ‘আদব’ বা শিষ্টাচারকে জ্ঞানের পূর্বশর্ত বলা হয়েছে—যেখানে শিক্ষকের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।
যখন কোনো অভিভাবক ডাইনিং টেবিলে বা সন্তানের সামনে বসে শিক্ষকের যোগ্যতা, ব্যক্তিত্ব বা সিদ্ধান্ত নিয়ে উপহাস করেন, তখন শিশুর অবচেতন মনে শিক্ষকের অবস্থান ধূলিসাৎ হয়ে যায়। যে শিক্ষককে শিশু মনে মনে শ্রদ্ধা করতে পারে না, সেই শিক্ষকের দেওয়া কোনো উপদেশ বা পাঠ তার হৃদয় স্পর্শ করতে পারে না। ফলে ক্লাসরুমে শিক্ষার্থী শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকলেও মানসিকভাবে সে শিক্ষকের প্রতিটি কথাকে অগ্রাহ্য করতে শুরু করে।
প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ
অনেক অভিভাবক সন্তানের তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় নিয়েও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করেন। ইউনিফর্মের নিয়ম, মোবাইল ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা বা পরীক্ষার কড়াকড়ি নিয়ে বারবার বিতর্ক সৃষ্টি করা সুস্থ অভিভাবকত্বের লক্ষণ নয়।
অভিভাবকের গঠনমূলক পর্যবেক্ষণ অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা যেন অযাচিত খবরদারিতে রূপ না নেয়। প্রতিটি নিয়মের বিপরীতে গিয়ে সন্তানের জন্য বিশেষ ছাড় দাবি করলে শিশুর মনে ধারণা জন্মায় যে, সে সমাজের সমস্ত নিয়মের ঊর্ধ্বে। এই ‘আই অ্যাম এবাভ দ্য রুলস’ মানসিকতা পরবর্তীতে তাকে একজন আইন অমান্যকারী ও বিশৃঙ্খল নাগরিকে পরিণত করে।
সন্তানকে ভালোবাসার সঠিক পদ্ধতি
সন্তানকে ভালোবাসার অর্থ এই নয় যে তার সব অন্যায্য আবদার পূরণ করতে হবে এবং তার প্রতিটি আচরণকে বৈধতা দিতে হবে।
প্রকৃত ভালোবাসা হলো:
- সন্তানকে সত্য ও মিথ্যার,
ন্যায় ও অন্যায়ের স্পষ্ট সীমারেখা চেনানো। - ভুল করলে স্নেহমাখা কণ্ঠে তার দায় স্বীকার করানো।
- প্রয়োজনের সময় দৃঢ়ভাবে ও শান্ত কণ্ঠে ‘না’ বলতে পারা।
- তাকে শেখানো যে স্বাধীনতা সবসময় দায়িত্ববোধের সাথে আসে।
স্নেহের সাথে শৃঙ্খলার এক ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়ই হলো সন্তানের প্রতি মা–বাবার সবচেয়ে বড় উপহার।
শিক্ষক ও অভিভাবক: প্রতিদ্বন্দ্বী নয়,
সহযোগী
শিক্ষক এবং অভিভাবক একে অপরের প্রতিপক্ষ নন; তারা একটি শিশুর ভবিষ্যৎ নির্মাণের দুই প্রধান কারিগর। একটি পাখির দুটি ডানার মতো—একটি ডানা পরিবার, অপরটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এক ডানা দুর্বল হলে পাখি উড়তে পারে না।
আরও পড়ুন

উভয়ের উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন: শিক্ষার্থীর জ্ঞান, নৈতিকতা ও ব্যক্তিত্বকে সমৃদ্ধ করা। কোনো বিষয়ে মতভেদ তৈরি হলে তা সমাধানের সর্বোত্তম উপায় হলো বন্ধ দরজার পেছনে শিক্ষক ও অভিভাবকের সম্মানজনক আলোচনা। সন্তানের সামনে কোনোভাবেই শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিরোধ প্রকাশ করা উচিত নয়। যখন সন্তান দেখবে তার মা–বাবা এবং শিক্ষক একই লক্ষ্য নিয়ে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে কাজ করছেন, তখন সে নিজের পড়ালেখা ও আচরণে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল হতে বাধ্য হবে।
অভিভাবকদের জন্য বাস্তবসম্মত করণীয়
সন্তানের শিক্ষাজীবনকে সঠিক পথে রাখতে এবং তাকে প্রকৃত জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে অভিভাবকদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ:
- তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পরিহার: শিক্ষকের বিরুদ্ধে সন্তানের কোনো অভিযোগ শুনলেই সাথে সাথে উত্তেজিত না হয়ে শান্ত থাকুন।
- তথ্য যাচাই করুন: যেকোনো ঘটনার ক্ষেত্রে সন্তানের একপাক্ষিক বক্তব্য শুনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়ে শিক্ষকের সাথে কথা বলে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করুন।
- ভুল স্বীকারের অভ্যাস গড়ে তুলুন: সন্তান অন্যায় করলে তাকে আড়াল না করে নিজের ভুল স্বীকার করতে এবং ক্ষমা চাইতে উদ্বুদ্ধ করুন।
- মর্যাদাপূর্ণ যোগাযোগ: শিক্ষকের কোনো আচরণে আপত্তি থাকলে সন্তানের অনুপস্থিতিতে তাঁর সাথে সরাসরি,
সংযত ও সম্মানজনক ভাষায় আলোচনা করুন। - শিক্ষককে অবমূল্যায়ন না করা: সন্তানের সামনে কখনোই শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে কোনো মন্তব্য করবেন না।
- প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মকে সম্মান: প্রতিষ্ঠানের যৌক্তিক ও শৃঙ্খলাজনিত নিয়মগুলো সন্তানের স্বার্থেই মেনে চলার পরিবেশ তৈরি করুন।
- অতিরিক্ত প্রশ্রয় বর্জন: ভালোবাসুন মন খুলে,
কিন্তু সন্তানের অযৌক্তিক আবদার ও উচ্ছৃঙ্খলতাকে প্রশ্রয় দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। - আচরণের দায়ভার নিতে শেখানো: নিজের পড়ালেখা, বাড়ির কাজ এবং ক্লাসরুমের আচরণের দায় যেন শিক্ষার্থী নিজেই বহন করে,
সে বিষয়ে সচেষ্ট থাকুন। - নিয়মিত ফলোআপ: শুধু পরীক্ষার ফলাফলের সময় নয়,
সারা বছরই শিক্ষকের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে সন্তানের অগ্রগতি ও আচরণ সম্পর্কে খোঁজ নিন।
একটি শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ কেবল একটি নামীদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ভারী বইয়ের ব্যাগ কিংবা পরীক্ষার জিপিএ–৫ এর ওপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে পরিবার,
শিক্ষক এবং বিদ্যালয়ের সম্মিলিত মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ওপর।
সন্তানকে অন্ধ স্নেহে ঢেকে রেখে আমরা যেন তাকে শিক্ষার প্রকৃত নির্যাস থেকে দূরে ঠেলে না দিই। অভিভাবকের সচেতন ভালোবাসা এবং শিক্ষকের দিকনির্দেশনামূলক শাসন—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই একটি শিশুর জীবন শিক্ষার প্রকৃত আলোয় আলোকিত হয়ে উঠতে পারে।



