শিশুর ভর্তি প্রস্তুতি সিরিজ – ৩য় পর্ব: স্কুলে যাওয়ার জন্য বাচ্চার স্বাস্থ্যগত ও শারীরিক প্রস্তুতি

লেখক: শিশুশিক্ষা ও প্যারেন্টিং গবেষক মুফতি আব্দুল্লাহ আল হাদী [এম.এ, ঢাবি]

পরিচালক: তাকওয়া শিশু একাডেমি ও মাদরাসাতুল ঈমান, ঢাকা।

mufti-abdullah-al-hadi
Mufti Abdullah Al Hadi


ভূমিকা

সকালে নতুন ইউনিফর্ম পরে,
চকচকে জুতো পায়ে পিঠে ছোট একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে যখন একটি শিশু প্রথমবার স্কুলের গেট দিয়ে প্রবেশ করে,
তখন তার চোখের কোণে যেমন কৌতূহল ঝিলিক মারে,
তেমনি বুক কাঁপতে থাকে অচেনা পরিবেশের ভয়ে। অভিভাবক হিসেবে আমাদের বুকটা তো আরও বেশি ধুকপুক করেআমার খোকা কি ঠিকমতো লাঞ্চ করতে পারবে?
সোনা মনি কি বাথরুমে গিয়ে ভয় পাবে?”

স্কুলে ভর্তি মানেই কেবল ভালো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সিট নিশ্চিত করা বা একগাদা রঙিন বইখাতা কিনে ফেলা নয়। স্কুলে ভর্তি হওয়ার এই আনন্দময় যাত্রায় সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়,
তা হলো শিশুর শারীরিক প্রস্তুতি এবং সামগ্রিক শিশুর স্বাস্থ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স (AAP)-এর মতে,
স্কুলের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সফল হওয়ার প্রথম সোপান হলো একটি সুস্থ, সবল কর্মক্ষম দেহ।

স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি কেবল মনের নয়, শরীরেরও ব্যাপার। একটি শিশু যখন শারীরিকভাবে ফিট থাকে, তখন তার শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব কীভাবে আপনার সোনামণিকে স্বাস্থ্য শারীরিক দিক থেকে আগামী দিনের রোমাঞ্চকর পথচলার জন্য উপযুক্ত করে তুলবেন।

. স্বাস্থ্যগত প্রস্তুতি কেন জরুরি?

স্কুল জীবন মানেই এক নতুন রুটিন,
নতুন বন্ধু এবং এক বিশাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া। এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শিশুর শরীরকে প্রস্তুত করা অত্যন্ত জরুরি।

  • সুস্থ শরীর শেখার ক্ষমতা বাড়ায়: গবেষণায় দেখা গেছে, শারীরিকভবে সুস্থ পুষ্টিকর খাবার খাওয়া শিশুর মস্তিষ্কের নিউরোনাল কানেকশন বা স্নায়বিক সংযোগ দ্রুত তৈরি করে। এর ফলে স্মৃতিশক্তি শেখার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।
  • অসুস্থতা কম হলে উপস্থিতি বাড়ে: রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকলে সর্দি,
    কাশি বা পেটের পীড়ার মতো সাধারণ সমস্যাগুলো কম হয়। ফলে স্কুল কামাই হওয়ার আশঙ্কা কমে এবং পড়াশোনার গতি ঠিক থাকে।
  • আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়: একটি শিশু যখন দৌড়াতে পারে, বন্ধুদের সাথে স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে পারে এবং নিজের ভারী ব্যাগটি নিজে বহন করতে পারে,
    তখন তার ভেতরে একধরনের আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় যা তার শিশু বিকাশ এবং মানসিক বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
  • সামাজিক মেলামেশা সহজ হয়: শারীরিক সুস্থতা শিশুর ক্লান্তি দূর করে। চনমনে প্রাণবন্ত শিশু সহজেই অন্য শিশুদের সাথে মিশতে পারে এবং ক্লাসের বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারে।

. স্কুলে যাওয়ার আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা

বাচ্চাকে স্কুলে পাঠানোর অন্তত দুই থেকে তিন মাস আগে একজন শিশু বিশেষজ্ঞের (Pediatrician)
কাছে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা স্কুল এন্ট্রান্স হেলথ চেকআপ
করানো বুদ্ধিমানের কাজ।

  • উচ্চতা ওজন: শিশুর বয়স অনুযায়ী উচ্চতা ওজন ঠিক আছে কি না (BMI চার্ট অনুযায়ী) তা যাচাই করা জরুরি। এতে পুষ্টিহীনতা বা স্থূলতার ঝুঁকি আগেই ধরা পড়ে।
  • দৃষ্টিশক্তি (চোখ): ব্ল্যাকবোর্ডের লেখা দেখতে বা বই পড়তে কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে চোখ পরীক্ষা করান। অনেক সময় শিশুরা কম দেখার কথা বলতে পারে না,
    যা তাদের পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।
  • শ্রবণশক্তি: শিক্ষক ক্লাসে কী বলছেন তা পরিষ্কার শুনতে পাওয়ার ওপর নির্ভর করে শিশুর পড়াশোনার অগ্রগতি। কানের কোনো সমস্যা আছে কি না তা পরীক্ষা করে নিন।
  • দাঁতের স্বাস্থ্য: দাঁতে পোকা বা মাড়ির কোনো সমস্যা থাকলে তা শিশুর খাওয়ার রুচি কমিয়ে দিতে পারে এবং স্কুলে অস্বস্তির কারণ হতে পারে। তাই ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে দাঁত চেকআপ করিয়ে নেওয়া ভালো।
  • রক্তশূন্যতা (অ্যানিমিয়া): রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা পরীক্ষা করান। রক্তশূন্যতা থাকলে শিশু ক্লান্ত বোধ করে এবং পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে না।
  • প্রয়োজনীয় টিকা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী আপনার শিশুর বয়সভিত্তিক সব টিকা (যেমনএমএমআর,
    ডিপথেরিয়া, পোলিও বুস্টার ইত্যাদি) সম্পন্ন হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করুন।
  • দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে কী করবেন: শিশুর যদি অ্যাজমা, অ্যালার্জি বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে,
    তবে স্কুলের শিক্ষকদের তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে রাখুন এবং একটি ইমার্জেন্সি প্ল্যান তৈরি করুন।

. শিশুর দৈনন্দিন স্বাস্থ্যকর অভ্যাস

সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি হলো ভালো কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা। স্বাস্থ্যকর অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই গড়ে না উঠলে বড় বয়সে তা পরিবর্তন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

  • নিয়মিত ঘুম: থেকে বছর বয়সী শিশুর প্রতিদিন ১০১৩ ঘণ্টা এবং থেকে ১৩ বছর বয়সীদের ১১ ঘণ্টা গভীর ঘুমের প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম মস্তিষ্কের কোষগুলোকে সতেজ রাখে।
  • সকালে ওঠা: স্কুলে যাওয়ার তাড়া না রেখে শিশুকে একটু সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করান। এতে শরীর মন দুটোই ফুরফুরে থাকে।
  • হাত ধোয়া: খাওয়ার আগে এবং টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধোয়ার অভ্যাস করান। এটি অনেক মারাত্মক রোগ থেকে শিশুকে দূরে রাখবে।
  • দাঁত ব্রাশ: দিনে অন্তত দুইবার (সকালে নাশতার পর এবং রাতে ঘুমানোর আগে) সঠিকভাবে দাঁত ব্রাশ করার নিয়ম শিখিয়ে দিন।
  • গোসল পরিষ্কার পোশাক: প্রতিদিন নিয়মিত গোসল করা এবং পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন পোশাক পরা শারীরিক হাইজিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
  • নখ কাটা: সপ্তাহে অন্তত একবার শিশুর হাতের পায়ের নখ কেটে ফেলুন, যাতে ময়লা জমে জীবাণু পেটে না যায়।
  • টয়লেট ব্যবহারের অভ্যাস: স্কুলে যাওয়ার আগেই শিশুকে নিজে নিজে বাথরুম ব্যবহার করা, ফ্লাশ করা এবং সঠিকভাবে পরিষ্কার হওয়ার অভ্যাস রপ্ত করান।

. পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস

একটি শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি এবং মানসিক তীক্ষ্ণতার জন্য সুষম খাবারের কোনো বিকল্প নেই। শিশুর ভর্তি প্রস্তুতি সময় তার খাদ্যতালিকার প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে।

  • সকালের নাশতা কেন জরুরি: সকালের নাশতাকে দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার বলা হয়। এটি মস্তিষ্কে গ্লুকোজ সরবরাহ করে যা মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে। ডিমে প্রোটিন,
    ওটস বা লাল আটার রুটি এবং একটি ফল রাখতে পারেন।
  • টিফিনে কী দেওয়া উচিত: স্কুলের টিফিনের বক্সে ফাস্টফুড বা প্রক্রিয়াজাত খাবারের বদলে ডিমের স্যান্ডউইচ,
    ঘরে তৈরি নুডলস, মৌসুমি ফল, সেদ্ধ ডিম বা বাদাম দিতে পারেন।
  • কী দেওয়া উচিত নয়: প্যাকেটজাত জুস, চিপস,
    কোল্ড ড্রিংকস বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং মেজাজ খিটখিটে করে।
  • পর্যাপ্ত পানি পান: ডিহাইড্রেশন বা পানির ঘাটতি শিশুর ক্লান্তি বাড়ায়। একটি আকর্ষণীয় ওয়াটার বোতলে সারাদিনের জন্য পরিমাণমতো বিশুদ্ধ পানি সাথে দিন এবং চুমুকে চুমুকে পানি খাওয়ার অভ্যাস করান।
  • অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুডের ক্ষতি: জাঙ্ক ফুড বা ফাস্টফুড শিশুর স্থূলতা বাড়ায় এবং পুষ্টির ঘাটতি তৈরি করে। তাই ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি শিশুকে অভ্যস্ত করুন।

. শারীরিক প্রস্তুতি

স্কুলে গিয়ে টানা কয়েক ঘণ্টা বসে থাকা,
ব্যাগ টানা বা খেলাধুলা করাএসবের জন্য শিশুর পেশি হাড়ের শক্তি প্রয়োজন।

  • দৌড়ানো লাফানো: প্রতিদিন বিকেলে খোলা মাঠে বা পার্কে দৌড়ানো,
    লাফানো বা সাইকেল চালানোর সুযোগ করে দিন। এতে শিশুর গ্রস মোটর স্কিল (Gross Motor Skills) উন্নত হয়।
  • সিঁড়ি ওঠা: লিফটের পাশাপাশি মাঝে মাঝে সাবধানে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার অভ্যাস করা পায়ের পেশিকে শক্তিশালী করে।
  • ব্যাগ বহন: শিশুর শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি ভারী ব্যাগ যেন তার পিঠে না দেওয়া হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন। সঠিক উপায়ে দুই কাঁধে ব্যাগ নেওয়ার অভ্যাস করান।
  • বসা দাঁড়ানো: পড়ার টেবিলে সোজা হয়ে বসা এবং মেরুদণ্ড টান টান রাখার অভ্যাস ছোট থেকেই তৈরি করুন,
    যা পরবর্তী সময়ে পিঠের ব্যথা রোধ করবে।
  • সূক্ষ্ম মোটর দক্ষতা (Fine
    Motor Skills):
    স্কুলে লেখার জন্য আঙুলের পেশির শক্তি বাড়ানো জরুরি। এর জন্য কিছু চমৎকার উপায় রয়েছে:

(১) পেন্সিল ধরা: সঠিকভাবে পেন্সিল বা ক্রায়ন ধরার অভ্যাস করানো।

(২) কাঁচি ব্যবহার: শিশুদের জন্য উপযোগী সেফটি সিজার দিয়ে কাগজ কাটা।

(৩) রং করা: জলরং বা পেন্সিল কালার দিয়ে ছবি আঁকা।

(৪) বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টানো: বইয়ের পৃষ্ঠা এক এক করে আলতোভাবে উল্টানোর অভ্যাস করা।

. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর উপায়

স্কুলে গেলে অন্য শিশুদের সংস্পর্শে এসে সর্দিকাশি বা সাধারণ ফ্লু হওয়া খুব স্বাভাবিক। তবে শিশুর ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী থাকলে এসব সংক্রমণ সহজেই মোকাবিলা করা যায়।

  • পর্যাপ্ত ঘুম: ইমিউন সিস্টেমের কোষগুলো পুনর্গঠিত হয় গভীর ঘুমে।
  • সুষম খাদ্য: ভিটামিন সি (কমলা, মাল্টা), ভিটামিন ডি এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার।
  • খোলা বাতাসে খেলাধুলা: ঘরের বন্দিদশা কাটিয়ে মুক্ত বাতাসে খেলাধুলা করা।
  • প্রাকৃতিক সূর্যের আলো: সকালের নরম রোদে কিছুক্ষণ কাটালে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি হয়,
    যা হাড় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য দারুণ উপকারী।
  • পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা: জীবাণু থেকে দূরে থাকার সঠিক অভ্যাস গড়ে তোলা।

. স্কুলে যাওয়ার আগে মানসিক শারীরিক সমন্বয়

শরীর এবং মনের মেলবন্ধন ছাড়া কোনো প্রস্তুতিই পূর্ণ হয় না। স্কুল রেডিনেস বা স্কুলমুখী মানসিকতা গড়ে তোলার সময় কিছু বিষয় মাথায় রাখা দরকার:

  • অতিরিক্ত চাপ নয়: বাচ্চাকে পড়ার জন্য অতিরিক্ত চাপ দেবেন না। আনন্দের ছলে তাকে সবকিছু শেখান।
  • খেলাধুলার গুরুত্ব: পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাকে সমান গুরুত্ব দিন। খেলাধুলা শিশুর মনকে প্রফুল্ল রাখে।
  • স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ: মোবাইল বা টেলিভিশনের সামনে দীর্ঘ সময় কাটানো শিশুর দৃষ্টিশক্তি শারীরিক সক্রিয়তা নষ্ট করে। ডব্লিউএইচও নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিন।
  • নিয়মিত রুটিন: স্কুলে যাওয়ার অন্তত দুই সপ্তাহ আগে থেকে একটা নির্দিষ্ট ঘুমানোর এবং ওঠার রুটিন চালু করুন যাতে শরীরের বায়োলজিক্যাল ক্লক সেট হয়ে যায়।

. অভিভাবকদের সাধারণ ভুল

অনেক সময় অজ্ঞতা বা অতিরিক্ত তাড়াহুড়োর কারণে অভিভাবকরা কিছু ভুল করে ফেলেন,
যা শিশুর স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে:

  • জোর করে খাওয়ানো: বাচ্চাকে অতিরিক্ত খাওয়াতে গিয়ে বমি করিয়ে ফেলা বা জোর করে মুখের ভেতর খাবার ঠেসে দেওয়া।
  • রাত জাগানো: কার্টুন বা পড়াশোনার নামে রাত জাগার অভ্যাস করিয়ে সকালে ঘুম থেকে তুলতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া।
  • অতিরিক্ত কোচিং: বছরের ছোট্ট শিশুর ওপর অতিরিক্ত কোচিং বা পড়ার চাপ সৃষ্টি করা।
  • ব্যায়ামের সুযোগ না দেওয়া: সারাদিন ঘরের ভেতর বসিয়ে রেখে শারীরিক পরিশ্রম থেকে দূরে রাখা।
  • অসুস্থ শিশুকে স্কুলে পাঠানো: সামান্য জ্বর বা সর্দি থাকলেও ক্লাসে পাঠিয়ে দেওয়া, যা অন্য শিশুদেরও সংক্রমিত করে।

১০. বাস্তব উদাহরণ

মিরপুরের বাসিন্দা মালিহা বেগম তার ছয় বছরের ছেলে আরিয়ানকে নিয়ে বেশ চিন্তায় ছিলেন। আরিয়ান একটু অলস প্রকৃতির ছিল এবং সকালের নাশতা খেতেই চাইত না। স্কুলে ভর্তির সময় ঘনিয়ে আসায় ম্যাডাম শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেন।

তিনি দেখলেন আরিয়ানের শরীরে সামান্য ভিটামিনের ঘাটতি রয়েছে এবং তার স্লিপিং প্যাটার্ন অনিয়মিত। মালিহা আপা একটি দারুণ কৌশল নিলেন। তিনি প্রতিদিন বিকেলে আরিয়ানকে সাথে নিয়ে পার্কে হাঁটতে যেতেন এবং তাকে দিয়ে ছোটখাটো শারীরিক এক্সারসাইজ করাতেন। সকালের নাশতায় বৈচিত্র্য এনে ডিম ফলের শেক তৈরি করে দিতেন যা দেখতে আকর্ষণীয় ছিল। আরিয়ানের ঘুমানোর সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়ায় তার শরীরের ক্লান্তি দূর হলো। মাত্র এক মাসের মধ্যে আরিয়ান শুধু শারীরিকভাবে চনমনেই হয়ে উঠল না,
বরং স্কুলের প্রথম দিন সে নিজেই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হাসিমুখে স্কুলে প্রবেশ করল।

১১. বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিশুস্বাস্থ্য শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা এক বাক্যে কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করে থাকেন:

  • আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স (AAP):
    শিশুর সঠিক শারীরিক বিকাশের জন্য প্রতিদিন অন্তত ৬০ মিনিট মাঝারি থেকে তীব্র শারীরিক কার্যক্রম বা খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
  • পুষ্টিবিদদের মতামত: শিশুর খাবারে যেন কৃত্রিম রং বা প্রিজারভেটিভযুক্ত খাবার না থাকে। ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং পরিপাকতন্ত্র সুস্থ রাখে।
  • শিক্ষা গবেষকগণ: শারীরিক ক্লান্তি শিশুর একাগ্রতা নষ্ট করে। তাই পড়াশোনার মাঝে ছোট ছোট বিরতি দিয়ে খেলাধুলা বা হালকা চলাচলের সুযোগ দেওয়া উচিত।

১২. অভিভাবকদের জন্য চেকলিস্ট

আপনার শিশু স্কুলে যাওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত কি না,
তা যাচাই করতে নিচের চেকলিস্টটি ব্যবহার করুন:

  • পর্যাপ্ত ঘুম (প্রতিদিন ১৩ ঘণ্টা নিশ্চিত করা হয়েছে)
  • সকালের নাশতা খাওয়ার নিয়মিত অভ্যাস গড়ে উঠেছে
  • সারাদিনের জন্য বিশুদ্ধ পানির বোতল প্রস্তুত আছে
  • পুষ্টিকর স্বাস্থ্যকর টিফিন বক্সের ব্যবস্থা করা হয়েছে
  • পরিষ্কার ফিটফাট পোশাকের অভ্যাস করা হয়েছে
  • নিজে নিজে বা টয়লেটে গিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস হয়েছে
  • বয়সভিত্তিক সকল প্রয়োজনীয় টিকা সম্পন্ন হয়েছে
  • স্কুল ব্যাগের ওজন শিশুর ওজনের ১০ শতাংশের নিচে আছে
  • প্রতিদিন অন্তত ঘণ্টা মুক্ত বাতাসে খেলাধুলার সুযোগ রয়েছে
  • পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা (চোখ,
    কান, দাঁত ওজন) করানো হয়েছে

উপসংহার

একটি শিশুর শিক্ষা জীবন এক সুদীর্ঘ ম্যারাথনের মতো। এই ম্যারাথনে সফল হওয়ার জন্য তার যেমন মানসিক শক্তির প্রয়োজন,
তেমনি প্রয়োজন একটি শক্তিশালী সুস্বাস্থ্যপূর্ণ শারীরিক ভিত্তি। শুধু বইখাতা বা ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না;
বরং তার পুষ্টি,
ঘুম, স্বাস্থ্য এবং শারীরিক সক্ষমতার যত্ন নেওয়াটাই একজন সচেতন অভিভাবকের সবচেয়ে বড় কর্তব্য। মনে রাখবেন, সুস্থ শরীরই শিশুর সুন্দর শিক্ষাজীবনের প্রথম ভিত্তি।

৫টি গুরুত্বপূর্ণ মূল শিক্ষা

  • স্কুলের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সফল হওয়ার পূর্বশর্ত হলো শিশুর শারীরিক মানসিক সুস্বাস্থ্য।
  • স্কুলে ভর্তি করানোর আগেই শিশুর দৃষ্টিশক্তি,
    শ্রবণশক্তি, দাঁত সার্বিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত।
  • নিয়মিত ঘুম,
    সুষম খাবার এবং হাইজিন বা পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
  • দৌড়াতে পারা,
    লাফানো এবং পেন্সিল ধরা বা সূক্ষ্ম মোটর দক্ষতার মাধ্যমে শিশুর শারীরিক প্রস্তুতি নিশ্চিত হয়।
  • অতিরিক্ত পড়ালেখার চাপের চেয়ে শিশুর বয়সোপযোগী খেলাধুলা এবং আনন্দময় পরিবেশ তার সঠিক বিকাশে বেশি কার্যকরী।

আপনার সোনামণির স্কুল রেডিনেস বা শারীরিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে আজই তার একটি হেলথ চেকআপ করিয়ে নিন এবং তার দৈনন্দিন রুটিনে স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলো যুক্ত করুন। এই আর্টিকেলটি আপনার অন্যান্য অভিভাবক বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন যাতে তারাও তাদের সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর জন্য সঠিকভাবে প্রস্তুত করতে পারেন। আপনার কোনো মতামত বা প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট বক্সে আমাদের জানাতে ভুলবেন না!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top